সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এমন কবি শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক

 এমন কবি যখন শিল্পকলার পরিচালক:- 

​কবির জন্ম হয় না, বরং তার সৃষ্টি হয়। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি সময়ের কণ্ঠস্বর, সমাজের প্রতিচ্ছবি, এবং অনুভূতির রূপকার। তিনি শব্দের জাদুকর, যিনি জীবনের কঠিন সত্যগুলোকেও এক নিমেষে সুরেলা করে তোলেন। যখন আমরা একজন কবির কথা বলি, তখন আমাদের মনে আসে এক ভিন্ন জগৎ। সেই জগৎ ভালোবাসা, বেদনা, আশা, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নের মিশেলে তৈরি।

​একজন কবি তার লেখায় জীবনের বিভিন্ন রঙ তুলে ধরেন। তাঁর কলমে যেমন বসন্তের নতুন পাতার গল্প থাকে, তেমনি থাকে ঝরা পাতার বিষণ্ণতা। তিনি মানব মনের গভীরতম অনুভূতিগুলোকে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা আমাদের নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কথাগুলোকেও যেন জাগিয়ে তোলে। একজন কবির কবিতা শুধু কিছু শব্দ নয়, বরং তা আমাদের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি।

মাজলুমের আর্তনাদ, জালিমের জম।

​তাই, একজন কবি শুধু লেখেন না, তিনি আমাদের শেখান কীভাবে জীবনকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে হয়। তাঁর প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে এক নতুন অর্থ, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। তিনি এক পথপ্রদর্শক, যিনি আমাদের স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেতে পারেন, আবার বাস্তবতার মুখোমুখিও দাঁড়াতে শেখান। একজন কবি চিরঞ্জীব, কারণ তার লেখা কখনো শেষ হয় না, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের অনুপ্রাণিত করে যায়।


কিন্তু একজন কবি যখন তার নীতি ও আদর্শ থেকে সরে এসে ক্ষমতার সঙ্গে আপস করেন, তখন তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে, তার কবিতা বা লেখালেখিকে কেবল শিল্পের মাপকাঠিতে বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

​কবির নৈতিক অবস্থান

​একজন কবিকে প্রায়শই সমাজের বিবেক হিসেবে দেখা হয়। তিনি যখন অন্যায়, অবিচার, বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা না বলে উল্টো স্বৈরশাসকের পক্ষ নেন, তখন তিনি কেবল তার ব্যক্তিগত আদর্শই বিসর্জন দেন না, বরং তার শিল্পসত্তার প্রতিও বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এমন আচরণ তার লেখার গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই নষ্ট করে দেয়।

​শিল্পের উদ্দেশ্য

​যদি কোনো কবির লেখার মূল উদ্দেশ্যই হয় শাসকের স্তুতি করা বা সাধারণ মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা, তবে সেই লেখা আর শিল্প থাকে না, বরং তা প্রচারে পরিণত হয়। শিল্প মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করে, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং তাদের নিজস্ব বিবেককে জাগ্রত করে। কিন্তু যখন তা এই কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার মূল্য থাকে না।

​একজন কবির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে যে তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়াবেন, কারণ তার কলমেই থাকে পরিবর্তনের শক্তি। যদি সেই কলমই অন্যায়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তার সাহিত্যিক পরিচয় যতই বড় হোক না কেন, মানুষের মনে তার প্রতি শ্রদ্ধা আর থাকে না।


গত সতের বছর চুপ থাকা, স্বৈরশাসকের সাথে আতাত করা কোনো কবি যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ব্যর্থ হয়েছেন বা বরং স্বৈরশাসকের দোসর হয়েছেন, তিনিই শিল্পকলার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হন, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্খলন নয়, বরং পুরো শিল্প ও সংস্কৃতির জন্যই এক বড় ধাক্কা।

​শিল্পের স্বাধীনতা ও শিল্পের অবক্ষয়

​শিল্পকলা একাডেমি হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা স্বাধীনভাবে হওয়া উচিত। এর মূল লক্ষ্য থাকে শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং মৌলিকতাকে বিকশিত করা, যাতে তারা সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু যখন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হন এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজেই শিল্পের মূল আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছেন, তখন সেই স্বাধীনতা ব্যাহত হয়।

​তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সমাজের সত্যকে তুলে ধরার পরিবর্তে কেবল শাসকদের গুণগান গাইতে বাধ্য হতে পারে। এর ফলে প্রকৃত শিল্পীদের কণ্ঠ রোধ করা হয়, এবং শিল্পের মূল উদ্দেশ্য - সমাজকে জাগ্রত করা - ব্যাহত হয়।

​শিল্পের নৈতিকতা এবং পরিচালকের ভূমিকা

​পরিচালক হিসেবে তার ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল সকল শিল্পীর জন্য একটি নিরাপদ ও নিরপেক্ষ স্থান তৈরি করা। কিন্তু যখন তিনি নিজেই অন্যায় ও দুর্নীতির অংশ হয়ে যান, তখন তার সেই পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। তার অধীনে তরুণ শিল্পীরা কেবল আপস করতে শেখে, প্রতিবাদ করতে নয়। এই ধরনের পরিস্থিতি আমাদের সংস্কৃতিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

​এমন পরিস্থিতিতে, একজন কবির ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কেবল তার নিজস্ব জীবনের সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো শিল্প জগতকে কলুষিত করে তোলে। এটি দেখায় যে ক্ষমতা কীভাবে একজন প্রতিভাবান মানুষকে তার আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং সমাজের ক্ষতি করতে পারে।

আশাকরি আমার কথা গুলো কেউ ব্যক্তিগত ভাবে নিবেন না,

আমি একজন পাঠক হিসেবে গত সতের বছরে যা দেখেছি - বুঝেছি

তাই তুলে ধরেছি।

কারো প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, সমস্যা ও নেই।

সাহিত্য ভালোবাসি তাই লিখলাম।

✍️ মোহাম্মদ মিজান


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫