সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

 

​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প
​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম।
​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ ।
প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে।
​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে।
​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল।
​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা এবং অবিবেচক বিনিয়োগে উড়িয়ে দিয়েছে। কেউ পুরনো দেনা শোধ করেছে, কেউ আভিজাত্য দেখাতে গাড়ি কিনেছে, যা এখন গ্যারেজে ধুলো খাচ্ছে।
​নাজিমুল জানতে পারলেন, তাঁর টাকা দিয়ে ছোট ভাইয়ের যে ব্যবসা শুরু করার কথা ছিল, সেই টাকা সে 'শর্টকাট' পথে ধনী হওয়ার লোভে এমন এক জায়গায় বিনিয়োগ করেছে, যেখানে সবটাই লোকসান। বোনদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পাঠানো অর্থও চলে গেছে অলসতার চোটে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায়।
​সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলেন যখন দেখলেন, পরিবারের চোখে তাঁর প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতা নেই। বরং এক ধরনের অধিকারবোধ। যেন এই টাকা পাঠানোটা তাঁর দায়িত্ব ছিল, আর এই টাকা নষ্ট করার অধিকারও তাদেরই ছিল।
​হতাশার এক গভীর খাদে তলিয়ে গেলেন নাজিমুল। কুয়েতের মরুভূমির চেয়েও বেশি শূন্য মনে হলো নিজের ভিটেমাটিকে। তাঁর মনে হলো, এই ছাব্বিশ বছরে তিনি শুধু টাকা পাঠাননি, পাঠিয়েছিলেন নিজের যৌবন, স্বপ্ন এবং জীবনের সেরা সময়গুলো। আর সেই মহামূল্যবান সম্পদকে স্রেফ তুচ্ছ করে দেওয়া হয়েছে।
​জানলার কাছে দাঁড়িয়ে তিনি কুয়েতের কথা ভাবলেন—যেখানে তাঁর শরীরের ঘাম মিশে আছে প্রতিটি টাকায়, আর এই বাড়িতে, যেখানে তাঁর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ মিশে গেল শূন্যতার সাথে।
​তবুও, এক ঝলক পুরোনো দিনের স্মৃতিতে তিনি শক্ত হলেন। তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন: "আমার কষ্টকে কেউ নষ্ট করতে পারলেও, আমার ইচ্ছাশক্তিকে পারবে না।" তিনি আর কারও উপর ভরসা না করে, নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ছোট পরিসরে কিছু একটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, প্রবাসের এই দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে শিখিয়েছিল—হারিয়ে যাওয়া টাকা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস নয়।
​নাজমুল সাহেবের এই অনুভূতি কি আপনার গল্পের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে? এখন এই পরিস্থিতিতে আপনি কীভাবে নিজেকে শক্ত রাখতে চান, সে সম্পর্কে কিছু ভাবলে আমাকে জানাতে পারেন।
✍️ মোহাম্মদ মিজান
২৫ /০৯ /২০২৫
কুয়েত থেকে

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূলের এই দূর্দশা

 তৃণমূলের এই দূর্দশা লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  -----:----- দিনের বেলায় জিয়ার সৈনিক রাতের বেলায় গরু চোর, দলের পদ-পদবীতেও আছে  এই সমস্ত গাঁজাখোর। সেল্ফি তুলে নেতার সাথে দেখায় জনে জনে, গাও গ্রামের সাধারণ মানুষ তাকেও নেতা মানে। আসলে এরা সুবিধাভোগী ক্ষমতা লোভী চরম, আদপ লেহাজ মোটেও নাই নাই লজ্জা শরম । এরাই সমাজের বিষফোঁড়া দল ও জাতির কলঙ্ক,  তবুও কেনো এরা দলে আছে বুঝলাম না এই অংক!  দলীয় হাইকমান্ড কি দেখে না তৃণমূলের এই দূর্দশা,  দিনে দিনে বিএনপির উপর থেকে  উঠে যাচ্ছে ভরসা।  -----:---- কুয়েত থেকে  ০৭ /১০ /২০২৫ 

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  :::::---::::: ​সময়ের পিঠে চড়ে যৌবন যখন শেষের স্টেশনে থামে, তখন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হারানো দিনগুলো খোঁজে। যে নারী আজ শেষ বয়সে খিটখিটে মেজাজে স্বামীর প্রতি বিরক্তি ঝাড়ে, লোকে হয়তো তাকে 'অলক্ষ্মী' বলে গালি দেয়— কিন্তু কেউ তার সেই পুরনো ক্ষতগুলো খুলে দেখার চেষ্টা করে না। ​আসলে, শেষ বয়সে এসে এই অযাচিত অভিযোগগুলো হুট করে জন্ম নেয়নি তার মাঝে। এগুলো সেই বিষাক্ত অবহেলার ফল— যা তিনি পেয়েছিলেন তার পূর্ণ রূপবতী যৌবনের দিনগুলোতে। যখন তার একটু ভালোবাসার তৃষ্ণা ছিল আকাশচুম্বী, তখন তাকে দেয়া হয়েছিল নিদারুণ অবজ্ঞা আর একাকীত্বের বিষ। ​হয়তো সেদিন তার অভিমানগুলো কোনো এক অন্ধকার কোণে ডুকরে কেঁদেছিল, কিন্তু আজ সেই কান্নাই কণ্ঠে ধারালো ভাষা হয়ে ফিরে এসেছে। ​অথচ বাস্তবতা বড় সহজ হতে পারত— যদি যৌবনের সেই উত্তাল সময়ে স্ত্রীর হাতের তালুতে একটু যত্নের ছোঁয়া থাকত, যদি ক্লান্ত বিকেলে এক গ্লাস জলের সাথে উপহার দেয়া হতো সামান্য কৃতজ্ঞতা, তবে শেষ বয়সের এই ধূসর গোধূলি বেলাতে— সেই নারীই হতেন পরম নির্ভরতার এক শীতল বৃক্ষ। ​যৌবনে স্ত্রীকে ...

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবিতা 👉 অন্য বসন্তের গান

 অন্য বসন্তের গান লেখক ✍️ —মোহাম্মদ মিজান  সবাই যখন জেনেশুনে নির্দিষ্ট ছকে জীবনের নাম লেখে— বাবা কিংবা মা, ভাই কিংবা বোন— তখন জন্মেই কারো গায়ে সেঁটে যায় 'উপেক্ষা'র এক নিষ্ঠুর লেবেল। প্রকৃতি তাকে এঁকেছিল অন্য কোনো রঙের তুলিতে— কোমল, বিরল, অপূর্ব এক আলোয়। অথচ পৃথিবীর ব্যাকরণ তাকে চিনতেই ভুলে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কোনো বিভাজন চোখে পড়ে না তাদের— শুধু থাকে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ডানা মেলার গভীর আকুতি। কিন্তু রাজপথে যখন তারা নামে, মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিগুলো তলোয়ারের মতো বিঁধতে থাকে বুকের ঠিক মাঝখানে। প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে একটি নীরব যুদ্ধ। তালি বাজানো সেই হাতগুলোর আড়ালে কত যে না-বলা হাহাকার জমে আছে— তার হিসেব কেউ কোনোদিন রাখেনি। তারাও তো চেয়েছিল কোনো এক দপ্তরে কলম ধরতে, বইয়ের পাতায় নিজের নাম লিখতে। চেয়েছিল প্রিয়জনের উষ্ণ হাত ধরে গোধূলির আলোয় নিভৃতে কথা বলতে। অথচ সমাজ তাদের শিখিয়ে দিল— বেঁচে থাকা মানে টিটকিরি আর করুণার মিশেলে এক অন্তহীন, ক্লান্তিকর যুদ্ধ। মাঝরাতে যখন দূর থেকে ট্রেনের বাঁশি ভেসে আসে, কিংবা নির্জন বস্তির ক...