সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মানুষই কি পৃথিবীর একমাত্র হিংস্র প্রাণী?

 ​মানুষই কি পৃথিবীর একমাত্র হিংস্র প্রাণী? 

👁️‍🗨️👀

এক কঠিন জিজ্ঞাসা---

​পৃথিবীজুড়ে চলমান সংঘাত, যুদ্ধ এবং হানাহানির দৃশ্য দেখে প্রায়শই এই প্রশ্নটি মনে আসে: মানুষই কি এই গ্রহের সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী? চারপাশের নৃশংসতা যখন মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন হিংস্রতার সংজ্ঞা এবং এর ব্যাপ্তি নিয়ে এক গভীর বিশ্লেষণ জরুরি।

​বন্যপ্রাণীর জগতে হিংস্রতা সাধারণত দুটি কারণে ঘটে: বেঁচে থাকা এবং আধিপত্য স্থাপন। একটি বাঘ শিকার করে তার ক্ষুধা নিবারণের জন্য, দুটি নেকড়ে লড়াই করে দলের নেতৃত্ব বা আঞ্চলিক অধিকারের জন্য। তাদের এই আক্রমণ প্রবৃত্তি মূলত প্রাকৃতিক, অর্থাৎ প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার। এই হিংস্রতা কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা পূর্ব-পরিকল্পনার ফল নয়।

​অন্যদিকে, মানুষের হিংস্রতার প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষের আগ্রাসন প্রায়শই জৈবিক প্রয়োজনের সীমানা পেরিয়ে, লোভ, ক্ষমতা, আদর্শগত দ্বন্দ্ব, ধর্মপ্রথা এবং সম্পদের দখলের মতো বিমূর্ত কারণে সংগঠিত হয়। মানুষের হিংস্রতা যে দিক থেকে ভয়ংকর:


​১. পরিকল্পিত গণহত্যা ও যুদ্ধ: একমাত্র মানুষই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে লক্ষ লক্ষ স্বজাতীয়কে হত্যা করার জন্য যুদ্ধ বা গণহত্যা শুরু করতে পারে। অস্ত্র তৈরি এবং সেগুলো ব্যবহার করে বিশাল পরিসরে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ক্ষমতা মানুষের এক অনন্য এবং বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্য আছে।


​২. মানসিক ও অকারণ নিষ্ঠুরতা: বন্যপ্রাণী সাধারণত শিকারকে দ্রুত মেরে ফেলে। কিন্তু মানুষ কেবল হত্যাতেই ক্ষান্ত হয় না; মানসিক বা শারীরিক অত্যাচার, নির্যাতন এবং অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পাওয়ার মতো বিকৃত মনোবৃত্তি মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। অনেক সময় সামান্য মতবিরোধ, সেটা ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের জের ধরে মানুষ দীর্ঘমেয়াদী প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে।


​৩. জাতি, ধর্ম ও আদর্শের ভিত্তিতে বিভেদ: একমাত্র মানুষই নিজের তৈরি করা অদৃশ্য সীমানা (যেমন: জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস) নিয়ে এমন বিভেদ সৃষ্টি করে, যার ফলে একটি গোষ্ঠী অন্য একটি গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার চেষ্টা করে। এই ধরনের আদর্শগত সংঘাত অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায় না।

​তবে, এই নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি মানব সমাজের আরেকটি দিকও রয়েছে— 

সহমর্মিতা, ত্যাগ এবং ভালোবাসা। মানব সমাজেই বিজ্ঞান ও শিল্পের জন্ম হয়েছে, যা জীবনকে সুন্দর করেছে। মানুষই অন্যের কষ্টে সাড়া দেয়, ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে আসে এবং নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিপন্ন করে। এই দ্বৈততাই মানুষকে রহস্যময় করে তোলে।

​পরিশেষে বলা যায়, মানুষ হয়তো একমাত্র প্রাণী নয় যারা হিংস্রতা দেখায়, তবে নিঃসন্দেহে মানুষই সবচেয়ে জটিল, সচেতন এবং ধ্বংসাত্মকভাবে হিংস্র প্রাণী। আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে যেমন সহযোগিতা এবং উন্নতির জন্য ব্যবহার করতে পারি, তেমনি তা ব্যাপক সংঘাতের জন্যেও ব্যবহার করি। আজকের পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তাই দরকার বাইরের পশুদের শিকার করা নয়, বরং আমাদের ভেতরের এই অকারণ, লোভ-তাড়িত হিংস্র পশুটিকে নিয়ন্ত্রণ করা।

✍️ এআই মোহাম্মদ মিজান

কুয়েত থেকে

১৮ /১০ /২০২৫ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫