সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গল্পের নাম: প্রতিবেশীর 'প্রেম' ও ৫৩টি বছরের ঘুম:

গল্পের নাম: প্রতিবেশীর 'প্রেম' ও ৫৩টি বছরের ঘুম:

এসে বন্ধু বেসে, ডাকাতি করে দেশে, 

পাশের বাড়ির দাদা, 

বীর বাঙালি, দিলো শুধু হাতে তালি, 

ছিল ৫৩ বছর গাঁধা।


আহ্, কী চমৎকার একটি ছড়া! এর মধ্যে তো এক গভীর ব্যঙ্গ আর হতাশার সুর লুকিয়ে আছে। এই ছন্দের ওপর ভিত্তি করে একটি গল্প অবশ্যই লেখা যেতে পারে। ছড়ার প্রতিটি লাইনে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে একটি রূপকধর্মী গল্প লিখে দিলাম ।👇


​গল্পের নাম: প্রতিবেশীর 'প্রেম' ও ৫৩টি বছরের ঘুম:

​গ্রামের নাম 'শান্তিপুর'। নামে শান্ত হলেও, গ্রামটির কপালে ছিল অশান্তির কালো মেঘ। শান্তিপুরের পাশেই ছিল আরেক সমৃদ্ধ গ্রাম, নাম 'সম্পত্তিগঞ্জ'। এই সম্পত্তিগঞ্জের মোড়ল ছিল এক কূটবুদ্ধিসম্পন্ন, ধূর্ত লোক, যার নাম ছিল ভূষণ চন্দ্র। ভূষণ দেখতে যেমন সুপুরুষ, কথায় তেমনই মধু, আর ব্যবহারে যেন মাটির মানুষ। শান্তিপুরের সবাই তাকে ডাকত, 'ভূষণ দাদা'।

​ভূষণ দাদার মুখে সবসময় থাকত ভালোবাসার বাণী, "তোমরা আমার ভাই, তোমরা আমার বন্ধু। তোমাদের ভালো মানেই আমার ভালো।" এই মিষ্টি কথায় ভুলে শান্তিপুরের মানুষজন তাকে মাথায় তুলে রাখত। ভূষণ দাদা যখন যা চাইত, শান্তিপুরের সরল মানুষজন অম্লানবদনে দিয়ে দিত।

​"এসে বন্ধু বেসে ডাকাতি করে দেশে"

​ভূষণ দাদা প্রতিবেশীর বেশে শান্তিপুরে আসত, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ডাকাতি। প্রথমে সে ছোট ছোট জিনিস চাইত। "বন্ধু, তোমাদের পুকুরের কয়েকটা মাছ দাও না, আমার ছেলের জ্বর," - এই বলে সে শান্তিপুরের ভরা পুকুর উজাড় করে নিয়ে যেত। "ভাই, তোমাদের ক্ষেতের ফলনটা দারুণ, আমাদের জমিটা তো ঊষর, কিছু ফসল ধার দেবে?" - এই বলে সে শান্তিপুরের সেরা শস্যের গোলা শূন্য করে দিত। যখন কেউ প্রতিবাদ করতে যেত, ভূষণ দাদা চোখের জল ফেলে বলত, "ছিঃ বন্ধু, তোমরা আমাকে কী ভাবছ? আমি তো তোমাদেরই লোক! আমি কি কখনও তোমাদের ক্ষতি করতে পারি?"

​বছরের পর বছর ধরে এই 'বন্ধুত্বপূর্ণ ডাকাতি' চলতে লাগল। শান্তিপুরের মানুষজন দেখত তাদের ঘর খালি হচ্ছে, পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে, ক্ষেতে ফসল নেই, শান্তিপুরের মানুষ মরে অনাহারে। অথচ ভূষণ দাদার চেহারা ফুলেফেঁপে উঠছিল, তার সম্পত্তিগঞ্জ আরও ঝলমলে হচ্ছিল।

​"পাশের বাড়ির দাদা"

​শান্তিপুরের মানুষেরা এই ভূষণ দাদাকে কখনও সন্দেহ করত না। তারা ভাবত, দাদা তো তাদেরই ভালো চায়, হয়তো খারাপ সময় এসেছে, তাই নিজেদের থেকে কম খাচ্ছে। কিন্তু ভূষণ দাদা সুযোগ পেলেই শান্তিপুরের তরুণদের বোঝাত, "তোমাদের এই জীর্ণ বাড়িগুলোর দরকার নেই। তোমরা বরং আমাদের সম্পত্তিগঞ্জে এসো। এখানে কত সুযোগ, কত আধুনিকতা! তোমাদের এই পুরনো সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে কী হবে?"

​এভাবেই একসময় শান্তিপুরের অধিকাংশ সম্পদ, সংস্কৃতি, এমনকি তরুণ প্রজন্মও সম্পত্তিগঞ্জের জৌলুসে আকৃষ্ট হয়ে চলে যেতে লাগল। শান্তিপুরের বয়স্ক মানুষেরা চোখে অন্ধকার দেখত।

​"বীর বাঙালি দিলো শুধু হাতে তালি"

​যখন কেউ সাহস করে ভূষণ দাদার কার্যকলাপের বিরুদ্ধে মুখ খুলত, তখন শান্তিপুরের বাকিরা উল্টে তাকেই থামিয়ে দিত। "আরে চুপ কর! ভূষণ দাদা আমাদের উপকার ছাড়া অপকার করে না। ওসব বাজে কথা বলিস না।" কেউ যখন বলত, "দেখছিস না, ভূষণ দাদা আমাদের সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে," তখন বাকিরা উল্টে তার পিঠ চাপড়ে বলত, "বাহ! দাদা তো কত ভালো! নিজের বাড়ির লোকের মতো ব্যবহার করছে!"

​প্রতিটি 'ডাকাতির' পর ভূষণ দাদা একটি লম্বা বক্তৃতা দিত, বন্ধুত্বের মহানুভবতা নিয়ে। আর শান্তিপুরের 'বীর বাঙালি'রা সেই ভাষণে মুগ্ধ হয়ে শুধু হাততালি দিত। তারা দেখত তাদের দেশ খালি হচ্ছে, তবুও ভূষণ দাদার প্রশংসা করে তারা নিজেরা গর্বিত হতো।

​"ছিল ৫৩ বছর গাঁধা।"

​এইভাবে কাটল তেপান্নটি বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুধু হাততালি দিয়ে গেল। একদিন এক যুবক, যার নাম ছিল 'সঞ্জীব', সে দেখল তার গ্রামের শেষ শস্যদানাটিও ভূষণ দাদার লোকজন নিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে ঘোর কাটল। সে চিৎকার করে বলল, "আর না! আর কোনো বন্ধুত্ব নয়!"

​কিন্তু সঞ্জীবের কথায় কেউ কান দিল না। সবাই বলল, "চুপ কর! ৫৩ বছর ধরে দাদা আমাদের সাহায্য করে আসছে। তুই কী বলছিস?"

​সঞ্জীব তখন বলল, "তেপান্নট্টি বছর ধরে আমরা ঘুমিয়েছিলাম, বন্ধুরা! এই ৫৩ বছরে ভূষণ দাদা আমাদের যা যা দিয়েছে, তা আসলে ছিল আমাদেরই সম্পদ, যা সে 'বন্ধুর বেশে' চুরি করেছে। আমরা নিজেদের 'বীর বাঙালি' ভাবি, অথচ নিজের ভিটেমাটি ডাকাতি হতে দেখে শুধু হাততালি দিয়েছি। আমরা তো ৫৩ বছরের ঘুমন্ত 'গাঁধা' ছাড়া আর কিছুই নই!"

​সঞ্জীবের এই তীব্র সত্যি কথায় শান্তিপুরের মানুষের বুকে প্রথম ধাক্কা লাগল। তারা দেখল, ভূষণ দাদার ডাকাতিটা আসলে নতুন নয়, এটা চলছিল তাদের জন্মেরও আগে থেকে। তাদের পূর্বপুরুষরাও এই 'বন্ধুত্বের ফাঁদে' পড়েছিল।

​পরের দিন থেকে শান্তিপুরের মানুষজন আর ভূষণ দাদাকে 'দাদা' বলে ডাকল না। তারা হাততালি দেওয়া বন্ধ করল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, এবার তারা নিজের দেশ নিজেরাই রক্ষা করবে। বন্ধুত্বের আড়ালে থাকা ডাকাতির মুখোশ তারা আর পরতে দেবে না।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মতলববাজ ভূষণ দাদাও তার দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন সহ দুই হাজারের অধিক

ছাত্র জনতা ও শিশু শহীদ হয়।

৪০ হাজারের অধিক ছাত্র-জনতা আহত হয়, পালিয়ে যায় ভূষণ দাদার স্বৈরাচার মুক্ষিরাণী ও তার দোসরেরা।

কিন্তু শান্তিপুরের সর্বত্র ষড়যন্ত্রের বীজ রোপণ করার চেষ্টা করে ভূষণ দাদারা র এজেন্টদের মাধ্যমে,

শান্তিপুরের মানুষ এখনো শান্তিতে নেই কখনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন আবার কখনো বিমান বন্দরে আগুন লাগিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে যাচ্ছে।

শান্তিপুরের মানুষ শপথ নিয়েছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেকোনো মূল্যে শান্তিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনবেই।

---(ইনশাহ আল্লাহ) - - - 

✍️ মোহাম্মদ মিজান 

কুয়েত থেকে 

২২ /১০ /২০২৫ 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫