সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটি নীল পদ্মের অপমৃত্যু

 একটি নীল পদ্মের অপমৃত্যু

— মোহাম্মদ মিজান (কুয়েত থেকে)

​মেয়েটার নাম ছিল নীলা (ছদ্মনাম)। মাস্টার্স শেষ করা একটা মার্জিত মেয়ে। সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নে তাদের পরিবারের একটা বিশেষ সুনাম ছিল। সরকারি কর্মকর্তা বাবার আদরের মেয়েটি যখন স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করল, সবাই ভেবেছিল ওর জীবনটা হবে বসন্তের মতো। কিন্তু সেই জীবনে কালবৈশাখী হয়ে এলো আকাশ।

​অন্ধ ভালোবাসার চরম মূল্য:

ভদ্র ঘরের শিক্ষিত মেয়েরা অনেক সময় বখাটে ছেলেদের "পরিবর্তন করার" এক অদ্ভুত মায়ায় পড়ে। নীলাও ভেবেছিল তার ভালোবাসা দিয়ে সে আকাশকে ভালো করবে। আকাশ নামের সেই মাদকসেবী বখাটে যুবককে সুস্থ ধারার জীবনে ফেরাতে নীলা আর তার মা নিজেদের জীবনের সবটুকু বিলিয়ে দিলেন। মা আর মেয়ের সমস্ত সোনার গয়না বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দিলেন আকাশের হাতে— যাতে সে বিদেশ গিয়ে একটা কাজ করে মানুষ হতে পারে।

​বিদেশের হাতছানি বনাম রাজনীতির নেশা:

কিন্তু যার রক্তে মিশে আছে চাঁদাবাজি আর নেশার অন্ধকার, তাকে কি কোনো দেশ বদলাতে পারে? আকাশ বিদেশ গিয়েও মন টেকেনি। কাউকে কিছু না বলে, কাজের মায়া ছেড়ে সে বারবার দেশে পালিয়ে আসত। গত ৫ই আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর সে চিরতরে দেশে ফিরে এলো। তার লক্ষ্য এখন "নেতা" হওয়া। সারাদিন মিছিলে চিল্কার, নেতার পেছনে ঘোরা আর রাতে নেশার আড্ডায় বুঁদ হয়ে থাকা—এই হলো তার রুটিন।

​এক জননীর নিরব কান্না:

সংসার কীভাবে চলে, সেই খবর আকাশ রাখে না। ছয় বছরের ছোট্ট মেয়েটা সবসময় অসুস্থ থাকে, অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা হয় না। দুধেভাতে থাকা নীলার জীবন এখন পাওনাদারদের গালমন্দ আর ভাইদের গয়না ফেরানোর অপমানে বিষিয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করলেই জুটত আকাশের খুনের হুমকি। শিক্ষকতার চাকরিটাও গেছে এই বখাটে স্বামীর কারণে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েটা শিক্ষিত হয়েও যেন আজ এক খাঁচায় বন্দি পশু।

​আঁচল ছেড়ে অজানার পথে:

যখন আর সহ্য করার শক্তি রইল না, তখন নিজের কোলের শিশুটিকে নিয়ে একদিন ঘর ছাড়ল নীলা। সে জানত না কোথায় যাবে, কিন্তু জানত এই নরকে আর থাকা সম্ভব নয়। অথচ নির্লজ্জ আকাশ নিজের দোষ ঢাকতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু করল নাটক। নীলার ছবি আর তার বৃদ্ধ বাবার মোবাইল নম্বর ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে সে এক "বিচ্ছেদের হাহাকার" অভিনয় শুরু করল। সে একবারও ভাবল না, এই একটা পোস্টের কারণে একটা শিক্ষিত মেয়ের মান-সম্মান আর তার পরিবারের মর্যাদা মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে।

​শেষ কথা:

নীলা আজ পলাতক। সে কি বখাটের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়েছে, নাকি সমাজের এই নিষ্ঠুর বিচার থেকে? একজন মাস্টার্স পাস করা মেয়ে আজ অসহায়! কারণ সে ভালোবেসে একজন ভুল মানুষকে সংশোধন করতে চেয়েছিল। আজ সেই বখাটে আর তার রাজনৈতিক ছত্রছায়ার ভয়ে সে আইনি ব্যবস্থা নিতেও সাহস পাচ্ছে না।

​আমাদের সমাজের "নীলারা" শিক্ষিত হয়েও কেন এত অসহায়? আর কত পরিবার ধ্বংস হলে এই বখাটেদের মুখোশ উন্মোচিত হবে?

​✍️ মোহাম্মদ মিজান 

কুয়েত থেকে

২২ /১২ /২০২৫


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫