সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রেমিট্যান্সের কান্না: দক্ষ জনশক্তি ও নিরাপদ অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ

 

রেমিট্যান্সের কান্না: দক্ষ জনশক্তি ও নিরাপদ অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ

​বাংলাদেশি অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো প্রবাসী রেমিট্যান্স। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের কারিগরদের জীবনের গল্পটা প্রায়ই হাহাকার আর বঞ্চনার। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রমবাজার কুয়েতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং অদক্ষতার বেড়াজালে আটকা পড়ে আমাদের প্রবাসীরা আজ দিশেহারা।

​১. অসম বিনিয়োগ ও আয়ের বৈষম্য

​একজন নেপালি বা ভারতীয় কর্মী যে সুযোগ-সুবিধায় কুয়েতে আসছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি তার সম্পূর্ণ উল্টো। যেখানে অন্যান্য দেশের কর্মীরা নামমাত্র খরচে ক্লিনিং বা সাধারণ পেশায় আসছেন, সেখানে একজন বাংলাদেশিকে গুণতে হচ্ছে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। অথচ মাস শেষে বেতন মাত্র ৭৫ কুয়েতি দিনার। মুদ্রার বিপরীতে এই আয়ের অঙ্কটি যখন ঋণের কিস্তির সামনে দাঁড়ায়, তখন তা আক্ষরিক অর্থেই 'আধুনিক দাসত্বে' রূপ নেয়। এই বিশাল বিনিয়োগ ও যৎসামান্য আয়ের ভারসাম্যহীনতা প্রবাসী পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

​২. 'ফ্রি ভিসা' ও অবৈধতার মরণফাঁদ

​ভিসার আকাশচুম্বী খরচ তুলতে গিয়ে অনেক প্রবাসী তথাকথিত 'ফ্রি ভিসার' ফাঁদে পা দিচ্ছেন। কুয়েতের আইনে এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে প্রতিনিয়ত স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানে ধরা পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ করে আসা একজন কর্মীর যখন দেশত্যাগ করতে হয়, তখন তার পুরো পরিবারটি সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এই অনিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

​৩. দক্ষ জনশক্তির অভাব ও মর্যাদার সংকট

​আমরা দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিং বা কনস্ট্রাকশন খাতের মতো অদক্ষ শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছি। অথচ বর্তমান বিশ্বে চাহিদার শীর্ষে রয়েছে দক্ষ পেশাজীবী। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ফিন্যান্স প্রফেশনাল পাঠাচ্ছে, আমরা তখন অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। এর ফলে আমরা কেবল আর্থিকভাবেই পিছিয়ে পড়ছি না, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের জাতীয় মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

​৪. উত্তরণের পথ ও আমাদের করণীয়

​এই সংকট থেকে উত্তরণে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি:

  • ভিসা সিন্ডিকেট নির্মূল: দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ভিসা বাণিজ্যের কালো হাত গুঁড়িয়ে দিতে হবে। অভিবাসন ব্যয় একটি সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা বাধ্যতামূলক।
  • বাজার সম্প্রসারণ ও কূটনৈতিক তৎপরতা: কুয়েত সরকারের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি এবং ব্যাংকিং খাতের মতো প্রফেশনাল সেক্টরে কর্মী পাঠানোর কোটা নিশ্চিত করতে হবে।
  • শ্রমিক সুরক্ষা ও মনিটরিং: যেসব কোম্পানি আকামা জটিলতা তৈরি করে বা বেতন বকেয়া রাখে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে।
  • ব্যক্তিগত সচেতনতা: "না জেনে, না বুঝে বিদেশ নয়"—এই মন্ত্রে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দালালের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা নষ্ট করার আগে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

​উপসংহার

​আমরা বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাইদের কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখতে চাই না, বরং এক একজন দক্ষ ও সম্মানিত পেশাজীবী হিসেবে দেখতে চাই। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর আত্মঘাতী মিছিল বন্ধ করে যদি আমরা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল পাঠাতে পারি, তবেই প্রবাসীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই হাহাকার বন্ধ হোক, নিরাপদ হোক প্রতিটি প্রবাসীর ঘাম ঝরানো পরিশ্রম।

✍️ মোহাম্মদ মিজান

কুয়েত থেকে 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূলের এই দূর্দশা

 তৃণমূলের এই দূর্দশা লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  -----:----- দিনের বেলায় জিয়ার সৈনিক রাতের বেলায় গরু চোর, দলের পদ-পদবীতেও আছে  এই সমস্ত গাঁজাখোর। সেল্ফি তুলে নেতার সাথে দেখায় জনে জনে, গাও গ্রামের সাধারণ মানুষ তাকেও নেতা মানে। আসলে এরা সুবিধাভোগী ক্ষমতা লোভী চরম, আদপ লেহাজ মোটেও নাই নাই লজ্জা শরম । এরাই সমাজের বিষফোঁড়া দল ও জাতির কলঙ্ক,  তবুও কেনো এরা দলে আছে বুঝলাম না এই অংক!  দলীয় হাইকমান্ড কি দেখে না তৃণমূলের এই দূর্দশা,  দিনে দিনে বিএনপির উপর থেকে  উঠে যাচ্ছে ভরসা।  -----:---- কুয়েত থেকে  ০৭ /১০ /২০২৫ 

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  :::::---::::: ​সময়ের পিঠে চড়ে যৌবন যখন শেষের স্টেশনে থামে, তখন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হারানো দিনগুলো খোঁজে। যে নারী আজ শেষ বয়সে খিটখিটে মেজাজে স্বামীর প্রতি বিরক্তি ঝাড়ে, লোকে হয়তো তাকে 'অলক্ষ্মী' বলে গালি দেয়— কিন্তু কেউ তার সেই পুরনো ক্ষতগুলো খুলে দেখার চেষ্টা করে না। ​আসলে, শেষ বয়সে এসে এই অযাচিত অভিযোগগুলো হুট করে জন্ম নেয়নি তার মাঝে। এগুলো সেই বিষাক্ত অবহেলার ফল— যা তিনি পেয়েছিলেন তার পূর্ণ রূপবতী যৌবনের দিনগুলোতে। যখন তার একটু ভালোবাসার তৃষ্ণা ছিল আকাশচুম্বী, তখন তাকে দেয়া হয়েছিল নিদারুণ অবজ্ঞা আর একাকীত্বের বিষ। ​হয়তো সেদিন তার অভিমানগুলো কোনো এক অন্ধকার কোণে ডুকরে কেঁদেছিল, কিন্তু আজ সেই কান্নাই কণ্ঠে ধারালো ভাষা হয়ে ফিরে এসেছে। ​অথচ বাস্তবতা বড় সহজ হতে পারত— যদি যৌবনের সেই উত্তাল সময়ে স্ত্রীর হাতের তালুতে একটু যত্নের ছোঁয়া থাকত, যদি ক্লান্ত বিকেলে এক গ্লাস জলের সাথে উপহার দেয়া হতো সামান্য কৃতজ্ঞতা, তবে শেষ বয়সের এই ধূসর গোধূলি বেলাতে— সেই নারীই হতেন পরম নির্ভরতার এক শীতল বৃক্ষ। ​যৌবনে স্ত্রীকে ...

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবিতা 👉 অন্য বসন্তের গান

 অন্য বসন্তের গান লেখক ✍️ —মোহাম্মদ মিজান  সবাই যখন জেনেশুনে নির্দিষ্ট ছকে জীবনের নাম লেখে— বাবা কিংবা মা, ভাই কিংবা বোন— তখন জন্মেই কারো গায়ে সেঁটে যায় 'উপেক্ষা'র এক নিষ্ঠুর লেবেল। প্রকৃতি তাকে এঁকেছিল অন্য কোনো রঙের তুলিতে— কোমল, বিরল, অপূর্ব এক আলোয়। অথচ পৃথিবীর ব্যাকরণ তাকে চিনতেই ভুলে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কোনো বিভাজন চোখে পড়ে না তাদের— শুধু থাকে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ডানা মেলার গভীর আকুতি। কিন্তু রাজপথে যখন তারা নামে, মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিগুলো তলোয়ারের মতো বিঁধতে থাকে বুকের ঠিক মাঝখানে। প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে একটি নীরব যুদ্ধ। তালি বাজানো সেই হাতগুলোর আড়ালে কত যে না-বলা হাহাকার জমে আছে— তার হিসেব কেউ কোনোদিন রাখেনি। তারাও তো চেয়েছিল কোনো এক দপ্তরে কলম ধরতে, বইয়ের পাতায় নিজের নাম লিখতে। চেয়েছিল প্রিয়জনের উষ্ণ হাত ধরে গোধূলির আলোয় নিভৃতে কথা বলতে। অথচ সমাজ তাদের শিখিয়ে দিল— বেঁচে থাকা মানে টিটকিরি আর করুণার মিশেলে এক অন্তহীন, ক্লান্তিকর যুদ্ধ। মাঝরাতে যখন দূর থেকে ট্রেনের বাঁশি ভেসে আসে, কিংবা নির্জন বস্তির ক...