ভার্চুয়াল নিষ্ঠুরতা ও সামাজিক অবক্ষয়: কারিনা কায়সারের প্রস্থান এবং আমাদের মগজের ব্যাধি
👀
মৃত্যু শাশ্বত, অনিবার্য। যেকোনো মানুষের মৃত্যুই শোকের, বেদনার। কিন্তু সমকালীন বাংলাদেশে মৃত্যুর চেয়েও এক ভয়াবহ সামাজিক মড়ক দেখা দিয়েছে ভার্চুয়াল জগতে—তা হলো 'ডেথ শেমিং' বা কারও মৃত্যুতে আনন্দোল্লাস ও নিষ্ঠুর উপহাস করা। সম্প্রতি তরুণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, লেখিকা ও সমাজকর্মী কারিনা কায়সারের অকাল মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের কুৎসিত, অমানবিক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জোয়ার দেখা গেছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। বরেণ্য ফুটবলার কায়সার হামিদের কন্যা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবাড়ু রানী হামিদের নাতনি হওয়ার পরিচয় ছাপিয়ে, তিনি একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একাংশের মন্তব্য দেখে মনে হয়, সমাজ থেকে দয়া, মায়া ও নূন্যতম শালীনতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সাইবার বুলিং ও বডি শেমিং:
স্থূলতা কি অপরাধ?
কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর কমেন্ট বক্সে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করা হয়েছে তার শারীরিক গঠন বা স্থূলতা নিয়ে। কাউকে তার শারীরিক অবয়ব নিয়ে উপহাস করা বা 'বডি শেমিং' করা একটি গুরুতর অপরাধ এবং তীব্র মানসিক বিকৃতির লক্ষণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও হরমোনজনিত বাস্তবতা: স্থূলতা সবসময় অতিরিক্ত খাওয়ার জন্য হয় না। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, থাইরয়েড, জিনেটিক কারণ বা বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও মানুষ মোটা হতে পারে। কিন্তু সাইবার জগতের একদল মানুষ কোনো বৈজ্ঞানিক বা মানবিক বোধ না রেখেই মানুষকে 'খোদার খাসি' বা ওজনের দাঁড়িপাল্লায় মেপে আনন্দ পায়।
দ্বিমুখী নীতি (Hypocrisy):
যারা এই মন্তব্যগুলো করছে, তাদের নিজেদের পরিবারে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও হয়তো কেউ না কেউ স্থূলতার শিকার। কিন্তু অন্যের বেলায় তারা নির্মম বিচারক বনে যায়।
রাজনৈতিক অন্ধত্ব ও ছবি সংস্কৃতির অপব্যবহার
আমাদের সমাজে যেকোনো ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক রঙ লাগানোর এক অন্ধ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি থাকার কারণে কাউকে 'ফ্যাসিস্টের দোসর' বা 'লুটপাটকারী' তকমা দেওয়া যেমন এক ধরনের সস্তা ও নোংরা রাজনীতি।
তবে কিছু লোক ছবি ব্যবসা করে অস্বীকার করছি না!
বাস্তবতা: একজন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে পেশাগত কারণে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বা নাগরিক হিসেবে অনেকেরই ছবি থাকতে পারে। একটি ছবি কখনো একজন মানুষের পুরো চরিত্র বা আদর্শের সনদ হতে পারে না।
গণভবনের লুটপাট ও নৈতিকতা:
৫ই আগস্ট গণভবনে যারা আনন্দোল্লাসের নামে মালামাল লুট করে নিয়ে গিয়েছিল, তারা কোনো পেশাদার চোর বা লুটেরা ছিলো না।
তারা যা করেছে তা ছিল গত ১৭ বছর স্বৈরাচার হাসিনার সরকারের জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ,
অথচ আজ ভার্চুয়াল জগতে নীতি কথা বলা মানুষদের অনেকেই হয়তো তথাকথিত সেই লুটপাটের নীরব বা সরব সমর্থক ছিল। নিজের ঘরের চোরকে আড়াল করে, মৃত মানুষের ওপর চুরির অপবাদ দেওয়া চরম ভণ্ডামি।
ধর্মীয় বিচারিক মানসিকতা এবং 'বেপর্দা' ট্যাগিং—কারিনা কায়সার নাটক করতেন, কন্টেন্ট বানাতেন এবং ওড়না ছাড়া চলতেন—এই অজুহাতে অনেকেই তাকে 'জাহান্নামী' বলে রায় দিয়ে দিয়েছেন। এটি ইসলামের নূন্যতম শিক্ষার পরিপন্থী।
ধর্মীয় অনুশাসন কী বলে?
ইসলামে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো মানুষ অন্য কোনো মানুষের জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারণ করার অধিকারী নয়। চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র মহান আল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা মৃত ব্যক্তিদের গালি দিও না বা তাদের মন্দ বলো না, কারণ তারা যা করেছে তার ফলাফলের কাছে তারা পৌঁছে গেছে (সহীহ বুখারী)।
পোশাকের স্বাধীনতা ও পারিবারিক চিত্র:
যারা অন্য নারীকে বোরকা বা হিজাব না পরার কারণে নরকবাসী বানাচ্ছেন, বুকে হাত দিয়ে তারা বলতে পারবেন না যে তাদের নিজেদের পরিবারের প্রতিটি নারী সদস্য সম্পূর্ণ পর্দানশীন। ইসলামের দাওয়াহ হতে হয় নরম ও ভালোবাসার চাদরে মোড়ানো, মৃত মানুষের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে ধর্ম প্রচার করা যায় না।
সাইবার ট্রাশ ও কমেন্ট বক্সের মনস্তত্ত্ব (The Dark Psychology)
সময় টিভির মতো মূলধারার গণমাধ্যমের কমেন্ট বক্সে যখন "কোরবানির বাকি ছিল", "পৃথিবীর ওজন কমলো" কিংবা "মদ মুখে দিও"র মতো পৈশাচিক মন্তব্য আসে, তখন বুঝতে হবে এই অপরাধীরা 'অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট' (Online Disinhibition Effect)-এ ভুগছে। স্ক্রিনের পেছনে লুকিয়ে নিজের আসল নাম-পরিচয় গোপন রেখে মানুষ তার ভেতরের সবচাইতে নোংরা ও পশুরূপী রূপটি বের করে আনে। এটি এক ধরনের মানসিক রোগ (Sadism), যেখানে অন্যের মৃত্যু বা কষ্ট দেখে মানুষ আনন্দ পায়।
পারিবারিক অশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা একদিনে তৈরি হয় না। এর মূলে রয়েছে:
১. পারিবারিক শিক্ষার অভাব: সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে দৌড়াতে শেখানো হলেও, মানুষ হিসেবে অন্যকে শ্রদ্ধা করার বা সহানুভূতির শিক্ষা পরিবার থেকে দেওয়া হচ্ছে না।
২. সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-শেয়ারের লোভ: সস্তা ট্রল, রোস্ট ভিডিও এবং নেতিবাচক কন্টেন্ট দেখে দেখে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ সহানুভূতিহীন রোবটে পরিণত হচ্ছে।
উত্তরণের উপায় এবং উপসংহার
"দোষ হলো আপনাদের মগজের, আপনাদের পারিবারিক অশিক্ষার"—।
এই অন্ধকার থেকে বের হতে হলে আমাদের কয়েকটি জায়গায় জরুরি পরিবর্তন প্রয়োজন:
👉 কঠোর আইন ও মডারেশন: সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত তাদের কমেন্ট সেকশন কঠোরভাবে মডারেট করা। যারা মৃত ব্যক্তি বা নারীদের নিয়ে এমন নোংরা মন্তব্য করে, তাদের আইডেন্টিফাই করে সাইবার আইনের আওতায় আনা উচিত।
আত্মশুদ্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: অন্যকে জাজ করার আগে নিজের দিকে তাকানো উচিত। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, যদি আমাদের দেখার চোখটা সুন্দর হয়।
কারিনা কায়সারের মৃত্যু আমাদের এই বার্তাই দিয়ে গেল যে, আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেলেও মানুষ হিসেবে কতটা পিছিয়ে পড়েছি। নিজের মগজ ও চিন্তাভাবনাকে পরিবর্তন না করলে, এই সমাজ ক্রমান্বয়ে একটি ভার্চুয়াল নরকে পরিণত হবে। আসুন, মৃত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে না পারি, অন্তত নীরব থাকি। মানুষের ভুলত্রুটির বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে, নিজেরা পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন আমীন।
©️✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন