সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমাদের ক্ষমা করে দিও রামিসা

 আমাদের ক্ষমা করে দিও রামিসা

-:-

একটি ৭ বছরের নিষ্পাপ শিশু, যে কেবল জীবনের আলো ছড়াতে শুরু করেছিল, তার সাথে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতা ও নির্মমতা স্তব্ধ করে দেয় পুরো মানবতাকে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠা ছোট্ট রামিসা, যার কাঁধে থাকার কথা ছিল স্কুলের ব্যাগ আর চোখে থাকার কথা ছিল রঙিন স্বপ্ন, সে আজ এক পৈশাচিকতার শিকার। মায়ের সেই আকুলতা, সকাল ১০টায় মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজে বেড়ানো, আর শেষমেশ পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় পড়ে থাকা জুতো দেখে বুক কেঁপে ওঠা—এই দৃশ্যপট কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

​নিষ্ঠুরতার সব সীমা পার হয়ে যখন একজন মানুষরূপী জানোয়ার বিকৃত যৌনাচারের পর অবলীলায় একটি শিশুকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে পারে, এবং তার সেই বীভৎস কাজে যখন তার নিজের স্ত্রীও সহযোগী হতে পারে, তখন বুঝতে হবে সমাজ কতটা পচে গেছে। শৌচাগারে পড়ে থাকা রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথা আর খাটের নিচের নিথর দেহ শুধু একটি শিশুর মরদেহ নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক নৈতিকতা ও মানবিকতার এক রক্তাক্ত কফিন।

​এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে কিছু তীক্ষ্ণ এবং এড়িয়ে না যাওয়ার মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়//


​পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়: পাশের ফ্ল্যাটেই এমন এক নরপশু বাস করছিল, অথচ কেউ টের পেল না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, একজন নারী ও স্ত্রী হয়ে কীভাবে আরেকজন নারী আরেকটি নিষ্পাপ শিশুর এই পরিণতি চেয়ে চেয়ে দেখল এবং আড়াল করতে চাইল? আমাদের প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, সামাজিক নজরদারি আর পারিবারিক মূল্যবোধ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

​রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার দায়: এমন নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটার প্রধান কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি অথবা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। রাষ্ট্র যদি এই ধরনের নরপশুদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এই সমাজ কখনোই শিশুদের জন্য নিরাপদ হবে না। আইনের ফাঁকফোকর গলে বা কালক্ষেপণের কারণে যখন অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তখন অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ে।


​নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি: একটি শিশু নিজের ঘরের পাশে, নিজের চেনা পরিবেশে সুরক্ষিত নয়—এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কী হতে পারে? রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা দিতে কতটা ব্যর্থ, তা রামিসার এই করুণ পরিণতি মনে করিয়ে দেয়।

​আমরা আর কতগুলো রামিসার লাশ দেখার পর জাগব? শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে আর মোমবাতি জ্বালিয়ে এই পচন রোধ করা সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের নির্মূল করার। জঘন্যতম এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে খুনি এবং তার সহযোগী স্ত্রীর এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যেন ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী এমন অপরাধ করার কথা কল্পনাও করতে না পারে।

আমি মনে করি এমন অপরাধীদের প্রকাশ্যে, একটা একটা অঙ্গ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে মৃত্যু নিশ্চিত করা।

 

গভীরভাবে মর্মাহত আমি — ​রামিসার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি, আর তার অভাগা মায়ের এই আজীবন বয়ে বেড়ানো তীব্র কষ্টের সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো সান্ত্বনা আমাদের কাছে নেই। আমরা লজ্জিত, আমরা ক্ষমাপ্রার্থী ছোট্ট রামিসা আমাদের ক্ষমা করে দিও।

আল্লাহ এমন কষ্ট পৃথিবীর কোনো মা বাবাকে আর দিও না। আমীন

✍️ মোহাম্মদ মিজান

কুয়েত থেকে

২০ /০৫ /২০২৬

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫