ইতিহাসের আদালত ও এক নির্বাসিত বিবেক
---:----
আমি সেই ভিটেমাটির গন্ধ আজও বুকে বয়ে বেড়াই, যার আকাশ আমাকে প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। অথচ আজ আমি দূর পরবাসের তপ্ত মরুরু এক কঠিন শয্যায় শুয়ে আকাশের তারা গুনি। আমার কোনো অপরাধ ছিল না—আমি লুণ্ঠন করিনি, সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্রে মাতিনি, কিংবা মেকি চাটুকারিতায় মেতে শাসকের দরবারে পুরস্কারের থালিও ভিক্ষা করিনি। আমার একমাত্র অপরাধ ছিল, আমি সত্যকে সত্য বলতে পেরেছিলাম; শাসকের রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যার কাছে নত করিনি আমার শির।
কালের কী অদ্ভুত পরিহাস! যুগে যুগে যারা সত্য উচ্চারণ করেছে, স্বদেশ তাদের দিয়েছে নির্বাসন, আর মিথ্যার সেবাদাসেরা পেয়েছে প্রাসাদের বিলাসিতা। শিকল আজ সত্যের হাতে, আর চাটুকারেরা মত্ত শাসকের বন্দনায়। কিন্তু আমি জানি, সময় এক নির্মম বিচারক। সে কারও তোষামোদ করে না, সে শুধু ধীরস্থায়ী অপেক্ষায় থাকে—যতক্ষণ না মিথ্যার মুখোশটি ধুলোয় খসে পড়ে।
ক্ষমতা যাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, একদিন তাদের দর্শনই হয়ে ওঠে ইতিহাসের পাঠ্য বই। শরীরটা হয়তো দূর পরবাসের কোনো অচেনা মাটিতে মিশে যায়, কিন্তু আদর্শিক বীরের বেশে তারা ফিরে আসে শত-সহস্র বছর পর, মানুষের বিবেকের প্রদীপ হয়ে।
ইতিহাসের পাতায় বিশ্বাসঘাতকতার কোনো অমরত্ব নেই। যারা ক্ষমতার লোভে, স্বার্থের মোহে নিজের বিবেক আর দেশকে বিকিয়ে দেয়, প্রচারের অলীক আলোয় তারা কিছুদিন প্রাসাদে টিকে থাকলেও—সময়ের আদালতে তাদের নাম লেখা হয় কেবলই অন্ধকারের কালিতে। শহীদের রক্তে ধোয়া, কৃষকের ঘামে ভেজা, আর মায়ের অশ্রুতে পবিত্র আমার এই রক্তাক্ত শ্যামল বাংলায় সেই জাতীয় শত্রুদের আর কোনো ঠাঁই নেই।
যে নদীর জলে শৈশব ধুয়েছ, যে মাটির রসে বেড়ে উঠেছ, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা মানে শুধু রাষ্ট্রের নয়, নিজের আত্মার সাথে প্রতারণা করা। জন্মভূমি তো কেবল কাটাতারে ঘেরা কোনো মানচিত্র নয়; এ যে মায়ের মুখ, বাবার ঘাম, শিশুর হাসি আর অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ। এই পবিত্র বন্ধন যে ছিঁড়ে ফেলে, সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, ইতিহাসের কাছে সে অতি ক্ষুদ্র, জাতির স্মৃতিতে সে চিরপরাজিত।
দিনশেষে রাজদণ্ড কিংবা অস্ত্রের গর্জন ইতিহাস লেখে না; ইতিহাস রচিত হয় মানুষের খাঁটি বিবেকে। স্বদেশের প্রতি প্রেম চিরকাল অমর, আর বিশ্বাসঘাতকতা চিরকালই ধিকৃত। এই বাংলা টিকে থাকবে তার সুসন্তানদের হৃদয়ে, কোনো কুসন্তানের পদচিহ্নে নয়।
-:-
✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
০৭/০৩/২০১৯
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন