অধিকারের মাপকাঠি
লেখক: মোহাম্মদ মিজান,
:-
ইউনিয়ন পরিষদ চড়াও হয়েছে উৎসবের আমেজে। গ্রামের কার্ডধারী গরিব মানুষগুলো চাল পেয়ে আজ ভীষণ খুশি। অভাবের সংসারে কয়েকটা দিন অন্তত নিশ্চিন্তে দু-মুঠো ভাত জুটবে, এই শান্তিতে সবার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। কিন্তু এই সরল মানুষগুলোর কেউই জানে না, বস্তায় ঠিক কত কেজি চাল তাদের দেওয়া হচ্ছে!
ঠিক তখনই ইউনিয়ন পরিষদের মাঠের এক কোণে ব্যক্তিগত একটা ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন নিয়ে এসে দাঁড়ালেন মোহাম্মদ মিজান। তিনি উচ্চকণ্ঠে সবাইকে ডাকলেন, "চাচা-খালারা, আপনারা কে কতটুকু চাল পেলেন, একটু মেপে দেখে যান। একটা পয়সাও লাগবে না, একদম ফ্রি!"
মিজানের কথা শুনে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে চালের বস্তা নিয়ে এগিয়ে এলো। ওজন দেওয়া শুরু হলো, আর মিজান পরম যত্নে প্রত্যেকের নামের পাশে চালের পরিমাণ খাতায় লিখে রাখতে লাগলেন।
কিন্তু এই খবর ইউনিয়ন পরিষদের দুর্নীতিবাজ কর্মীদের কানে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগলো না। খবর পাওয়া মাত্রই তারা হিংস্র পশুর মতো তেড়ে এলো মিজানের দিকে। আসবেই না কেন? মিজানের খাতার পাতায় যে তাদের কালো হাত আর চুরির খতিয়ান ফাঁস হয়ে যাচ্ছে! প্রতিটি অসহায় মানুষের বরাদ্দ থেকে তারা দুই-তিন কেজি করে চাল ওজনে কম দিচ্ছিল।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মিজান শান্ত গলায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের কাছে জানতে চাইলেন, "আপনারা কেন এমন উগ্র আচরণ করছেন? আমি তো শুধু মানুষের অধিকারের সঠিক মাপটা বুঝিয়ে দিচ্ছি।"
মিজানের এই ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন যেন তাদের গায়ে ফোসকা পরিয়ে দিল। একজন মেম্বার আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলো, "এই চাল মাপার আদেশ তোরে কে দিছে রে শালা? তুই ভাবছস কী নিজেরে?"
কথার পিঠে কথা বাড়লো। শুরু হলো মুখের ভাষায় চরম অসভ্যতা আর উগ্রতা—যা ভদ্রসমাজে মুখে আনাই দায়। শুধু মুখেই ক্ষান্ত হলো না তারা, একপর্যায়ে মিজানের ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে দিল। চারপাশের অসহায় মানুষগুলো ভয়ে আর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু মিজান দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে শুধু একটা ফোন করলেন।
ঠিক ১০ মিনিট! পুরো ইউনিয়ন পরিষদের মাঠ যেন কেঁপে উঠলো সাইরেনের শব্দে। চারিদিক থেকে এসে ঘিরে ধরলো সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। মাঠজুড়ে এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো।
হ্যান্ডমাইকে গমগম করে উঠলো এক অফিসারের কণ্ঠ, "কেউ নড়াচড়া করবেন না! যে যেখানে আছেন, ঠিক সেই অবস্থানে থাকুন।"
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এক তরুণ অফিসার। দেখতে বেশ সাধারণ, বয়স বড়জোর ২৫ থেকে ৩০ বছর। তিনি সোজা হেঁটে মিজানের দিকে এগিয়ে এলেন। পরম শ্রদ্ধায় মিজানের সাথে হাত মিলিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "গুড জব, কবি সাহেব! আপনার মতো দেশের প্রতিটা নাগরিক যদি এমন সচেতন হতো, তবে এই সমাজ থেকে চোর, বাটপার, ধোঁকাবাজ আর দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা এক নিমেষেই কমে যেত।"
এমন সময় মিজানের এক বিশ্বস্ত সহযোগী ভিড়ের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে বলল, "স্যার, আপনার নির্দেশনা মতো ওদের চাল চুরির আর মারধরের সব ভিডিও আমি মোবাইল ক্যামেরায় রেকর্ড করে রেখেছি।"
তরুণ অফিসার ভিডিওর প্রমাণটি লুফে নিলেন। এরপর মিজানের দিকে তাকিয়ে পিঠ চাপড়ে বললেন, "আবার দেখা হবে কবি। ভালো থাকবেন।" বলেই তিনি একটি আনুষ্ঠানিক সালাম ঠুকে বিদায় নিলেন।
পর মুহূর্তেই দৃশ্যপট বদলে গেল। ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই উগ্র ও দুর্নীতিবাজ কর্মীদের দুই হাত পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো। একে একে চোরের মতো মাথা নিচু করে তারা পুলিশের গাড়িতে গিয়ে উঠতে লাগলো।
যে মানুষগুলো এতক্ষণ ভয়ে কাঁপছিল, তাদের চোখে তখন বিজয়ের আনন্দ। সেদিন পুরো এলাকার মানুষের মুখে যে তৃপ্তির ও আনন্দের হাসি ফুটে উঠেছিল, তা সত্যিই কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।
আহ্! বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যদি এভাবেই হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা যেত, তবে এই দেশের প্রতিটি গরিব আর মেহনতি মানুষের মুখে চিরদিনের জন্য এমন হাসি ফুটে উঠতো।
---কুয়েত থেকে - -
২৪/০৫/২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন