🖤 পলাশীর শোকগাথা: নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীরমদন ও মোহনলালের বীরত্বগাথা 🖤
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তা শুধু একটি যুদ্ধের পরাজয় ছিল না; বরং তা ছিল এদেশীয় কিছু বিশ্বাসঘাতক এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চক্রান্তের এক চরম দলিল। আমি মোহাম্মদ মিজান, আমার বিভিন্ন কবিতায় মীরজাফর, ঘসেটি বেগম, উমিচাঁদদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার কথা যেমন তুলে ধরেছি, তেমনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীরমদন ও মোহনলালের দেশপ্রেম ও বীরত্বগাথাকে বারবার স্মরণ করেছি। আজ আবারও সেই রক্তক্ষরা ইতিহাসকে নতুন করে লেখার এই প্রয়াস।
👑 পটভূমি ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা: চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের জালে তরুণ নবাব
১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলার মসনদে বসেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সিংহাসনে আরোহণের পর থেকেই তাকে একাধারে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুর মুখোমুখি হতে হয়:
- অভ্যন্তরীণ কুচক্রী মহল: নবাবের আপন খালা ঘসেটি বেগম এবং প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান শুরু থেকেই সিরাজকে হঠানোর চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেন। এর সাথে যুক্ত হয় জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও উমিচাঁদের মতো প্রভাবশালী ও লোভী বণিক শ্রেণী।
- ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক আগ্রাসন: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের নির্দেশ অমান্য করে কোলকাতায় দুর্গ নির্মাণ (ফোর্ট উইলিয়াম) করে এবং দস্তক বা বাণিজ্য সনদের চরম অপব্যবহার করতে থাকে। আলিবর্দী খানের দৌহিত্র তরুণ সিরাজউদ্দৌলা এই ঔপনিবেশিক ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
🛡️ বিশ্বস্ততার দুই অনন্য স্তম্ভ: শহীদ মীরমদন ও বীর মোহনলাল
নবাবের দরবারে যখন চারদিকে ষড়যন্ত্রের জাল, তখন দুজন বীর সেনানী নবাবের প্রতি অটুট আনুগত্য ও দেশপ্রেমের অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন।
💥 শহীদ মীরমদন (গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান):
মীরমদন ছিলেন নবাবের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বীর সেনাপতি। ২৩ জুন যুদ্ধের শুরুতে মীরমদনের কামানের তীব্র আক্রমণের মুখে লর্ড ক্লাইভের ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটে আমবাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ভিজে যায় (যা মীরজাফরের চক্রান্তে ঢাকা দেওয়া হয়নি)। বৃষ্টি থামার পর ইংরেজদের শুষ্ক বারুদের গোলার আঘাতে এই বীর সেনানী যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। ইতিহাসবিদদের মতে, মীরমদনের মৃত্যুই ছিল পলাশী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
⚔️ বীর মোহনলাল (কাশ্মীরি দেশপ্রেমিক):
কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত মোহনলালকে নবাব প্রথমে 'পেশকার' এবং পরবর্তীতে 'দেওয়ান' পদে উন্নীত করেন। মীরমদনের মৃত্যুর পরও মোহনলাল এবং ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং প্রায় জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু মীরজাফরের কুচক্রী পরামর্শে নবাব যখন যুদ্ধ থামানোর ভুল নির্দেশ দেন, তখন মোহনলাল ক্ষোভে ও দুঃখে ফেটে পড়েন। তিনি নবাবকে যুদ্ধ না থামানোর অনুরোধ করলেও, শেষ পর্যন্ত নবাবের আদেশে বাধ্য হয়ে পিছু হটার সময়ই নবাবের বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
🎭 মীরজাফর ও সহযোগী চক্রের বিশ্বাসঘাতকতার প্রহসন
পলাশীর যুদ্ধ কোনো সামরিক শক্তির যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল মূলত ইতিহাসের নিকৃষ্টতম এক বিশ্বাসঘাতকতা।
- নবাবের পক্ষে ৫,০০০ অশ্বারোহী এবং ৭,০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে মীরমদন ও মোহনলাল প্রাণপণ লড়ছিলেন।
- অন্যদিকে মীরজাফর, রায়দুর্লভ এবং ইয়ার লতিফের অধীনে থাকা নবাবের মূল ৪২,০০০ পদাতিক ও ১৫,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী যুদ্ধের মাঠে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
- লর্ড ক্লাইভের মাত্র ৩,০০০ (যার মধ্যে ৯৫০ জন ইউরোপীয়) সৈন্যের কাছে নবাবের বিশাল বাহিনীর হেরে যাওয়ার মূল কারণ ছিল এই চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং মীরজাফরের দেওয়া ছদ্মবেশী ভুল পরামর্শ।
✊ ইতিহাসের শিক্ষা ও বিস্মৃতির অন্তরালে অন্য বীরেরা
আমি আমার বিভিন্ন কবিতায় তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ, মঙ্গল পাণ্ডে, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, বাহাদুর শাহ জাফর কিংবা ভাটির বাঘ শমসের গাজীর নাম উল্লেখ করেছি। পলাশী বিপর্যয়ের পর এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে লড়াই করেছেন। কিন্তু সঠিক ইতিহাসের চর্চার অভাবে মীরমদন বা মোহনলালের মতো বীরেরা আজ নতুন প্রজন্মের ভাবনার অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। আমাদের দায়িত্ব এই বীরদের ইতিহাসকে বারবার সামনে আনা।
📝 শেষ কথা
পলাশী দিবস কেবলই এক শোকগাথা নয়, এটি বাঙালির জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। মীরমদন ও মোহনলালের দেশপ্রেম আমাদের শেখায় কীভাবে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হয়। আর নবাব সিরাজউদ্দৌলার করুণ পরিণতি মনে করিয়ে দেয়, ঘরের শত্রুকে চিনতে না পারলে স্বাধীনতা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে।
২৩ জুনের এই দিনে ইতিহাসের এই মহান শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
২৩/০৬/২০২৬
#পলাশী_দিবস #নবাব_সিরাজউদ্দৌলা #মীরমদন #মোহনলাল #ইতিহাস #মোহাম্মদ_মিজান #বাংলা_ইতিহাস
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন