সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গল্প :- শিশু শ্রম

 শিশু শ্রমিক নিয়ে একটি গল্প লিখে দিতে পারি। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়।

​এখানে একটি মানবিক ও সংগ্রামের গল্প দেওয়া হলো:

গল্প:- শিশু শ্রম

​ছোট্ট রতন: ফুটপাতের কারিগর

​রতন নামের দশ বছরের ছেলেটা প্রতিদিন সকালে ঢাকার ব্যস্ততম মোড়ের পাশে ছোট একটা চায়ের দোকানে কাজ শুরু করে। তার দিন শুরু হয় কাঁচের গ্লাস ধোয়ার শব্দে আর আধপোড়া বিস্কুটের গন্ধে। সূর্য ওঠার আগেই রতন ঘুম থেকে ওঠে। তার চোখে এখনো ঘুমের রেশ, কিন্তু পেটের ক্ষুধা আর দোকানের মালিকের কড়া চাহনি তাকে বিশ্রাম নিতে দেয় না।

​রতন মূলত গ্রামের ছেলে। এক বছর আগে বাবার অসুখ আর মায়ের অসহায়তার কারণে তাকে শহরে আসতে হয়—এক আত্মীয়ের হাত ধরে, যে তাকে এই চায়ের দোকানে কাজ জুটিয়ে দেয়। আত্মীয়টি বলেছিলো, "কাজ করবি, দুবেলা খেতে পাবি, আর কিছু টাকাও জমা হবে।" কিন্তু রতনের জীবনে বিশ্রাম আর পড়ার সময়টা যেন অচেনা এক স্বপ্ন।

​সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত তার একটাই কাজ—চা বানানো, গ্লাস পরিষ্কার করা আর টেবিল মোছা। গরম চায়ের কেটলি ধরতে ধরতে তার ছোট্ট হাতে ফোসকা পড়ে যায়, আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে তার পিঠে একটা চাপা ব্যথা সবসময় লেগে থাকে। যখন অন্য বাচ্চারা স্কুলে ছোটে, তাদের কাঁধে বইয়ের ব্যাগ আর মুখে হাসি; রতন তখন দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে আর মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো পুরোনো খবরের কাগজের ছেঁড়া অংশ, যেখানে কখনো কখনো গল্পের ছবি বা একটা-দুটো রঙিন বিজ্ঞাপন থাকে। কাজের ফাঁকে, মালিকের চোখ এড়িয়ে, সে দ্রুত সেই ছবিগুলোতে চোখ বোলায়।

​একদিন, সন্ধের পরে, যখন দোকান একটু শান্ত, রতন ফুটপাতের ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে আপনমনে একটা ছেঁড়া খাতায় একটা বাঁকা-চোরা 'ক' লেখার চেষ্টা করছিল। পাশ দিয়ে যাওয়া একজন বয়স্ক শিক্ষক তাকে দেখতে পান। তিনি রতনের হাতে লেখাটা দেখে জিজ্ঞেস করেন, "কী লিখছিস খোকা?"

​রতন অপ্রস্তুত হয়ে খাতাটা লুকিয়ে ফেলে। শিক্ষকটি হেসে বললেন, "ভয় নেই। তুই কি স্কুলে যাস?" রতন মাথা নিচু করে জবাব দেয়, "না, স্যার। আমার কাজ আছে।"

​শিক্ষক তার ছোট্ট, রুক্ষ হাতটা ধরে বললেন, "লেখাপড়া করার বয়স তো এটা। জানিস, শিক্ষা হলো একটা আলো, যা তোর জীবনকে বদলে দিতে পারে।"

​সেই রাতে, রতন আর ঘুমোতে পারল না। শিক্ষকের বলা কথাগুলো তার কানের কাছে বাজতে থাকে। সে বুঝতে পারে, এই গ্লাস ধোয়া আর চা বানানোই তার গন্তব্য নয়। এই অন্ধকার ফুটপাত পেরিয়ে তাকে একদিন আলোর দিকে যেতে হবে।

​পরের দিন, রতন সাহসের সাথে দোকান মালিককে তার ইচ্ছার কথা জানায়—সে দুপুরে এক ঘণ্টা সময় চায়, কেবল একটু পড়াশোনা করার জন্য। মালিক প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু রতনের চোখে এত দিনের জমে থাকা সংকল্প দেখে এবং কিছু মানুষের চাপাচাপিতে শেষমেশ তিনি রাজি হন।

​এখনও রতনকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু দিনের বেলা এক ঘণ্টার জন্য, সেই বয়স্ক শিক্ষক এসে তাকে অ আ ক খ শেখান। রতনের জীবন হয়তো রাতারাতি পাল্টে যায়নি, কিন্তু তার মনে এখন একটা নতুন স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে। সে জানে, এই হাতে একদিন হয়তো গ্লাস থাকবে না, থাকবে কলম। সেই দিনটির অপেক্ষায় রতন প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

✍️ মোহাম্মদ মিজান 

​এই গল্পটি আপনার কেমন লাগলো? আপনি যদি চান, তাহলে এই ধরনের অন্য কোনো সামাজিক সমস্যা নিয়েও গল্প লিখতে পারি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূলের এই দূর্দশা

 তৃণমূলের এই দূর্দশা লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  -----:----- দিনের বেলায় জিয়ার সৈনিক রাতের বেলায় গরু চোর, দলের পদ-পদবীতেও আছে  এই সমস্ত গাঁজাখোর। সেল্ফি তুলে নেতার সাথে দেখায় জনে জনে, গাও গ্রামের সাধারণ মানুষ তাকেও নেতা মানে। আসলে এরা সুবিধাভোগী ক্ষমতা লোভী চরম, আদপ লেহাজ মোটেও নাই নাই লজ্জা শরম । এরাই সমাজের বিষফোঁড়া দল ও জাতির কলঙ্ক,  তবুও কেনো এরা দলে আছে বুঝলাম না এই অংক!  দলীয় হাইকমান্ড কি দেখে না তৃণমূলের এই দূর্দশা,  দিনে দিনে বিএনপির উপর থেকে  উঠে যাচ্ছে ভরসা।  -----:---- কুয়েত থেকে  ০৭ /১০ /২০২৫ 

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি

কবিতা :- অবহেলার ঋণ ও শেষ বিকেলের প্রাপ্তি লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান  :::::---::::: ​সময়ের পিঠে চড়ে যৌবন যখন শেষের স্টেশনে থামে, তখন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হারানো দিনগুলো খোঁজে। যে নারী আজ শেষ বয়সে খিটখিটে মেজাজে স্বামীর প্রতি বিরক্তি ঝাড়ে, লোকে হয়তো তাকে 'অলক্ষ্মী' বলে গালি দেয়— কিন্তু কেউ তার সেই পুরনো ক্ষতগুলো খুলে দেখার চেষ্টা করে না। ​আসলে, শেষ বয়সে এসে এই অযাচিত অভিযোগগুলো হুট করে জন্ম নেয়নি তার মাঝে। এগুলো সেই বিষাক্ত অবহেলার ফল— যা তিনি পেয়েছিলেন তার পূর্ণ রূপবতী যৌবনের দিনগুলোতে। যখন তার একটু ভালোবাসার তৃষ্ণা ছিল আকাশচুম্বী, তখন তাকে দেয়া হয়েছিল নিদারুণ অবজ্ঞা আর একাকীত্বের বিষ। ​হয়তো সেদিন তার অভিমানগুলো কোনো এক অন্ধকার কোণে ডুকরে কেঁদেছিল, কিন্তু আজ সেই কান্নাই কণ্ঠে ধারালো ভাষা হয়ে ফিরে এসেছে। ​অথচ বাস্তবতা বড় সহজ হতে পারত— যদি যৌবনের সেই উত্তাল সময়ে স্ত্রীর হাতের তালুতে একটু যত্নের ছোঁয়া থাকত, যদি ক্লান্ত বিকেলে এক গ্লাস জলের সাথে উপহার দেয়া হতো সামান্য কৃতজ্ঞতা, তবে শেষ বয়সের এই ধূসর গোধূলি বেলাতে— সেই নারীই হতেন পরম নির্ভরতার এক শীতল বৃক্ষ। ​যৌবনে স্ত্রীকে ...

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবিতা 👉 অন্য বসন্তের গান

 অন্য বসন্তের গান লেখক ✍️ —মোহাম্মদ মিজান  সবাই যখন জেনেশুনে নির্দিষ্ট ছকে জীবনের নাম লেখে— বাবা কিংবা মা, ভাই কিংবা বোন— তখন জন্মেই কারো গায়ে সেঁটে যায় 'উপেক্ষা'র এক নিষ্ঠুর লেবেল। প্রকৃতি তাকে এঁকেছিল অন্য কোনো রঙের তুলিতে— কোমল, বিরল, অপূর্ব এক আলোয়। অথচ পৃথিবীর ব্যাকরণ তাকে চিনতেই ভুলে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কোনো বিভাজন চোখে পড়ে না তাদের— শুধু থাকে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ডানা মেলার গভীর আকুতি। কিন্তু রাজপথে যখন তারা নামে, মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিগুলো তলোয়ারের মতো বিঁধতে থাকে বুকের ঠিক মাঝখানে। প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে একটি নীরব যুদ্ধ। তালি বাজানো সেই হাতগুলোর আড়ালে কত যে না-বলা হাহাকার জমে আছে— তার হিসেব কেউ কোনোদিন রাখেনি। তারাও তো চেয়েছিল কোনো এক দপ্তরে কলম ধরতে, বইয়ের পাতায় নিজের নাম লিখতে। চেয়েছিল প্রিয়জনের উষ্ণ হাত ধরে গোধূলির আলোয় নিভৃতে কথা বলতে। অথচ সমাজ তাদের শিখিয়ে দিল— বেঁচে থাকা মানে টিটকিরি আর করুণার মিশেলে এক অন্তহীন, ক্লান্তিকর যুদ্ধ। মাঝরাতে যখন দূর থেকে ট্রেনের বাঁশি ভেসে আসে, কিংবা নির্জন বস্তির ক...