গল্পের শিরোনাম: "রেমিট্যান্সের ওপারে"
১. স্বপ্ন-ভাঙ্গা যাত্রা:
ফজরের আজানের শব্দ তখনও মিলিয়ে যায়নি, যখন রহিম ভিটেমাটি আর প্রিয়জনদের ছেড়ে এয়ারপোর্টের পথে পা বাড়াল। চোখে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন—ছোট বোনের বিয়ে, মায়ের চিকিৎসা, আর ভিটার পাশে এক চিলতে পাকা বাড়ি। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি হলো মরুভূমির দেশে, যেখানে সূর্যের তেজ আর শ্রমিকের ঘামের গন্ধ মিশে একাকার।
প্রথম যখন সে দুবাই (বা আপনার পছন্দের যেকোনো দেশ) পৌঁছাল, তখন চারপাশের ঝলমলে আলো আর আকাশ ছোঁয়া ইমারত দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। এ যেন এক অন্য জগৎ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, এই চাকচিক্য তার জন্য নয়। তার জগৎ হলো লেবার ক্যাম্পের ছোট, স্যাঁতসেঁতে ঘরটি, যেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয় আরও দশজন শ্রমিকের সাথে।
২. কঠিন জীবন, নীরব কান্না:
রহিমের কাজ ছিল নির্মাণ সাইটে। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, কখনও বা তারও বেশি। প্রচণ্ড গরমে যখন পিচের রাস্তা গলে যায়, তখন তাকে ভারী সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে ছুটতে হয়। কাজের সময় একটাই কথা মাথায় ঘোরে—"দেশে টাকা পাঠাতে হবে।" ক্লান্তি বা অসুস্থতার জন্য ছুটি নেই বললেই চলে। একদিন কাজ কামাই মানেই বেতন কাটা, আর সেই কাটা বেতন মানেই পরিবারের খরচ থেকে একটুখানি কম।
সবচেয়ে কষ্টের ছিল একাকীত্ব। রাতে যখন সবাই ঘুমে ঢলে পড়ত, তখন রহিম তার ছোট মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে বাড়ির ছবি দেখত। মনে পড়ত ছোট ছেলের আবদার, স্ত্রীর উদ্বেগ ভরা কণ্ঠস্বর। কিন্তু ভিডিও কলে যখন কথা হতো, তখন সে সবসময় হাসিমুখে বলত, "আমি খুব ভালো আছি, কোনো চিন্তা করো না।" নিজের গলার চাপা কান্নাটুকু আর কপালের ঘামটুকু লুকিয়ে রাখত।
৩. বঞ্চনা ও যন্ত্রণা:
কষ্টের এখানেই শেষ নয়। বেশিরভাগ সময়ই বেতন পেতে দেরি হতো, কখনও বা সম্পূর্ণ বেতন দিতই না। একবার মালিকপক্ষের সাথে বেতনের ঝামেলা হওয়ায় রহিমকে প্রায় দু’মাস বিনা বেতনে কাজ করতে হয়েছিল। তার মতো আরও অনেকে প্রতিবাদ করতে ভয় পেত, কারণ প্রতিবাদ করলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয়, দেশের মাটিতে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার ভয়।
রোগ-শোকের সময় কেউ খোঁজ নেয় না। একবার তার প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল, কিন্তু ক্যাম্পের ছোট ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল খেয়েই তাকে কাজে যেতে হয়েছিল। সেই রাতে সে ছটফট করছিল, আর মনে মনে বলছিল, "এই কষ্টের বিনিময়ে যদি ওরা অন্তত ভালো থাকে।"
৪. রেমিট্যান্সের ওপারে:
পাঁচ বছর পর রহিম দেশে ফিরল। ততদিনে তার ছোট বোন বিয়ে হয়েছে, মায়ের চিকিৎসা হয়েছে, আর ভিটের পাশে একটা আধপাকা ঘরও উঠেছে। কিন্তু তার নিজের ভেতরে সব যেন শূন্য। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ, চোখে ক্লান্তি আর মুখে কষ্টের ছাপ।
পরিবারের সবাই তাকে জড়িয়ে ধরে হাসলেও, রহিম টের পায়—সেখানে তার পুরোনো সে মানুষটা নেই। তার হাসিটা এখন শুধু অভিনয়। কারণ, যে টাকা সে পাঠিয়েছে, তার প্রতিটা নোটের পেছনে লেগে আছে তার ঘাম, রক্ত আর না বলা কষ্টের ইতিহাস।
রহিম এখন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে। সে জানে, এই ঘরটা তার বানানো, কিন্তু এর প্রতিটা ইঁট যেন তাকে জিজ্ঞেস করে—"এত কষ্ট কেন সয়েছিলে?"
আর রহিম শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারণ, রেমিট্যান্সের ঝলমলে অঙ্কের ওপারে যে এক প্রবাসী শ্রমিকের নীরব যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা কেবল সে আর আল্লাহ্ই জানেন।
গল্পটি সকল প্রবাসী ভাই বোনের জীবনের দুঃখ-কষ্টের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উৎসর্গ করলাম।
✍️ মোহাম্মদ মিজান
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন