সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

​গল্পের নাম: অহংকারের ছায়া:

 


​গল্পের নাম: অহংকারের ছায়া:

লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান 

:-

​শহর থেকে কিছুটা দূরে, শ্যামল প্রকৃতির কোলে এক ছিমছাম বাড়ি ছিল। সেখানে বাস করত দুই বন্ধু—রহিম এবং রাকিব । তাদের বন্ধুত্ব ছিল এলাকার মানুষের কাছে এক উদাহরণ। তাদের সম্পর্ক বারো অক্ষরের—‘ভালোবাসার বন্ধন’ (B-H-L-B-S-R-B-N-D-H-O-N)। শৈশব থেকে তারা একসঙ্গেই বড় হয়েছে, তাদের সুখ-দুঃখের সব ভাগাভাগি ছিল।

​রহিম ছিল পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। তার তুলির জাদুতে ক্যানভাসে প্রাণ আসত। রাকিব ছিল একজন সাহিত্যিক , যার  লেখা কবিতা গল্প গান শুনে মন শান্ত হয়ে যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রহিমের খ্যাতি বাড়তে থাকে। তার চিত্রকর্ম দেশ-বিদেশে সমাদৃত হতে শুরু করে। পুরস্কার, সম্মান আর পরিচিতি—সবকিছুই আসতে থাকে তার কাছে।

​খ্যাতির এই চূড়ায় উঠে রহিমের মধ্যে ধীরে ধীরে এক পরিবর্তন আসতে শুরু করল। তার কথায় ফুটে উঠত এক সূক্ষ্ম অহংকার (অহংকার—এই ছোট্ট শব্দটি)। সে নিজেকে সুমিতের চেয়ে অনেক বেশি সফল, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করল।

​একদিন রাতে, রাকিব তার নতুন তৈরি করা একটি কবিতা রহিমকে শোনানোর জন্য নিয়ে এল। রাকিব আশা করেছিল, রহিম বরাবরের মতো তার কাজের প্রশংসা করবে। কিন্তু রহিম তখন একটি আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীর প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিল।

​রাকিব বলল, "শোন রহিম, এই কবিতাটা কেমন হয়েছে? পাহাড়ের নীরবতা আর নদীর কলতানকে একসাথে ধরতে চেয়েছি।"

​অমিত ক্যানভাস থেকে চোখ না সরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "শুনলাম। কিন্তু এটা আর এমন কী! খুবই সাধারণ। আমার আজকের এই প্রদর্শনীর সামনে তোমার এই কবিতার কোনো মূল্যই নেই, রাকিব। এসব করে আর কী হবে? প্রতিভা থাকলে লোকে নিজেই খুঁজে নেয়। দেখছ না, আমার কাজ বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছে! 

সারাপৃথীবির মানুষ আমাকে চিনে, 

আর তুমি এখনও ওই লোকাল অনুষ্ঠানে তোমার কবিতা গান শোনাচ্ছ?"

​রাকিবের মুখে একটা বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এল। এই প্রথমবার রহিমের কথায় সে এত গভীর আঘাত পেল। রাকিবের আজ মনে হল, তাদের বারো অক্ষরের 'ভালোবাসার বন্ধন' শব্দটি যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অহংকার নামক ছোট্ট শব্দটি তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে মুহূর্তে গ্রাস করে নিল।

​রাকিব নিঃশব্দে কবিতার ডায়েরিটা ব্যাগে ভরে নিল। সে মাথা নিচু করে বলল, "ঠিক আছে, রহিম । তোমার ব্যস্ততা আমি বুঝতে পারছি। ভালো থেকো।"

​এরপর রাকিব আর কোনোদিন রহিমের বাড়িতে যায়নি। রহিমও নিজের অহংকারের জগতে এতটাই মগ্ন ছিল যে, তার বন্ধুর নীরবতা তার চোখে পড়ল না। সে ভাবল, রাকিব হয়তো তার কথাতেই আঘাত পেয়ে দূরে সরে গেছে—যাকগে, তাতে কী!

​বছরখানেক পর, এক কঠিন অসুখে রহিমের হাত অসাড় হয়ে গেল। তার তুলি আর চলতে চাইল না, শরীর খারাপ হতে লাগলো। খ্যাতি আর প্রতিপত্তি দ্রুত ফিকে হতে শুরু করল। একাকিত্ব তাকে গ্রাস করল। সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল রহিমের কথা। যে রহিম সুখে দুঃখে সবসময় তার পাশে থাকত, তাকে অনুপ্রেরণা দিত।

​রাকিব তখন উপলব্ধি করল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা বা খ্যাতি ছিল না, ছিল রহিমের সঙ্গে থাকা 'ভালোবাসার বন্ধন'। শুধুমাত্র 'অহংকার'—এই একটি ছোট্ট শব্দের কারণে সে সেই অমূল্য সম্পদ এক নিমেষে হারিয়ে ফেলেছে।

​রহিম রাকিবকে খুঁজতে গেল। কিন্তু রাকিব ততদিনে গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। যাওয়ার আগে রাকিব শুধু একটি চিরকুট রেখে গিয়েছিল: 

"সম্পর্ককে অহংকার নয়, শ্রদ্ধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।"


রাকিবের এই ছোট্ট লেখটির কারণে

​রহিমের হৃদয়ে সেদিন এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হলো। সে বুঝতে পারল, অহংকার একটি ছোট্ট শব্দ হলেও, তা শুধু বারো অক্ষরের সম্পর্ককেই নয়, বরং জীবনের সব সুখ শান্তিকেও এক মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। সে তার সমস্ত সাফল্য সত্ত্বেও এক নিঃসঙ্গ মানুষে পরিণত হলো।


​নীতিশিক্ষা: অহংকারকে কখনও বন্ধুত্বের বা সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে দেওয়া উচিত নয়। ছোট একটি ভুল ধারণা বা অহংকারী আচরণ একটি সুদীর্ঘ সম্পর্ককে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিতে পারে।

---সমাপ্ত - - - 

কুয়েত থেকে

১৩ /১০ /২০২৫ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫