সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সোনালী যুগ

 ​সোনালী যুগ: নবুওয়াত ও সাহাবা জীবন — যা শুধু অন্ধের চোখেই অন্ধকার

​মানব ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতের যুগ এবং তাঁর আদর্শে গড়া সাহাবায়ে কেরামের জীবনকাল। এই যুগকে 'আলোর যুগ' বলা হয়, কারণ এটি অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা, মানবতা এবং একত্ববাদের উজ্জ্বল আলো নিয়ে এসেছিল। যারা এই যুগকে 'অন্ধকার যুগ' বলে আখ্যায়িত করে, তারা আসলে ইতিহাসের প্রকৃত মাহাত্ম্য অনুধাবনে অক্ষম, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।


​নবুওয়াতের যুগ: অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশা রাসূল (সাঃ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে সামাজিক অস্থিরতা, গোত্রীয় সংঘাত, নারী নির্যাতন অন্যায় অবিচার দূর্শাসন জুলুম অত্যাচারে ছিলো পরিপূর্ণ (যেমন কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া), এবং বহু-ঈশ্বরবাদের চর্চা ছিল প্রকট। এই সময়টাকেই তথাকথিত 'অন্ধকার যুগ' (আইয়ামে জাহেলিয়াত) বলা হতো। কিন্তু রাসূল (সাঃ) আল্লাহ্‌র বাণী নিয়ে এসে সেই অন্ধকারকে দূর করে দেন। তিনি এমন এক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেন, যা সকল মানুষের জন্য সমতা, ন্যায়বিচার এবং নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন:

​জ্ঞানার্জন: 'দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করো'—এই শিক্ষা দিয়ে তিনি জ্ঞানের গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন।

​মানবাধিকার: 'বিদায় হজের ভাষণ' ছিল বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার সনদগুলির মধ্যে অন্যতম।

​নৈতিকতা: ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তিনি সততা ও আমানতদারিতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

​সাহাবায়ে কেরামের যুগ: আদর্শের এক মূর্ত প্রতীক।

​রাসূল (সাঃ)-এর ওফাতের পর তাঁর সাহাবীগণ (রাঃ) সেই আলোর মশালকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন। তাঁদের যুগ ছিল ইসলামের আদর্শিক ও বাস্তব রূপায়ণের সোনালী অধ্যায়। তাঁদের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল:

​আল্লাহ্‌র প্রতি অবিচল আস্থা: তাঁরা পার্থিব ভোগ-বিলাসকে তুচ্ছ করে পরকালের সাফল্যের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।

​ন্যায়বিচার: খলিফা হযরত উমর (রাঃ)-এর ন্যায়বিচার এমন কিংবদন্তী ছিল যে, রাজ্যের শেষ প্রান্তে থাকা ব্যক্তিও নির্ভয়ে বিচার চাইত। শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না।

​ত্যাগের মহিমা: তাঁরা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল তুলনাহীন।


আজ রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে ​যারা সেই সোনালী যুগকে বলে 'অন্ধকার যুগ'

​যারা ইসলামের এই আদর্শিক ও জ্ঞানালোকিত সময়কে 'অন্ধকার যুগ' বলে—তাঁরা কেবল বাহ্যিক জৌলুস বা আধুনিক প্রযুক্তির অভাব দেখে মন্তব্য করে। কিন্তু সভ্যতাকে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে মাপা যায় না, তাকে মাপতে হয় নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞানচর্চা এবং ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে।

​আসলে, যারা অন্ধ, তারাই আলো ঝলমলে সোনালী যুগকে অন্ধকার বলে। যে চোখ হকের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে জানে না, যে মন সত্যকে উপলব্ধি করতে অক্ষম, কেবল তারাই মানবজাতির ইতিহাসে এই শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়ের মাহাত্ম্যকে অস্বীকার করতে পারে। এই যুগ ছিল মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, যা আজও কোটি কোটি মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা যোগায়। এই যুগকে অন্ধকার বলা আর সূর্যকে দেখে চোখ বন্ধ করে বলা যে, "আকাশে কোনো আলো নেই"—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

✍️ এআই মোহাম্মদ মিজান 

কুয়েত থেকে ১৫ /১০ /২০২৫ 


​আশা করি লেখাটি আপনার পছন্দ হয়েছে! 

আর কিছু জানতে চাইলে কমেন্ট করতে পারেন। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫