সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক: 'ফাঁসির ফল' ও রাজনৈতিক ভাষা পরিবর্তন

​"এতোদিন জামায়াতকে ব্যবহার করে এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছে বিএনপি। ফাঁসিতে ঝুলেছে জামায়াত নেতারা আর ফল ভোগ করছে বিএনপি।"

​এই উক্তিটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার জন্ম দেয়। নিচে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করা হলো:

​🇧🇩 জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক: 'ফাঁসির ফল' ও রাজনৈতিক ভাষা পরিবর্তন
​ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের আলোচ্য উক্তিটি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির একটি জটিল ও স্পর্শকাতর দিককে উন্মোচিত করে। তার এই বক্তব্যটি কেবল দুটি রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক বোঝাপড়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, বরং জোট রাজনীতিতে আদর্শিক আপস, ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক পরিণতি সম্পর্কেও গভীর ইঙ্গিত বহন করে।

​১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জোট ও কৌশলগত ব্যবহার
​বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক গাঁটবন্ধন শুরু হয় মূলত ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে। এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো। জামায়াত তার সাংগঠনিক শক্তি এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক দিয়ে বিএনপিকে শক্তিশালী করেছিল। এই সময়কালে, বিএনপি জামায়াতকে তাদের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভাগীদার হয়েছিল, যা ডা. তাহেরের "ব্যবহার করে" উক্তিটির প্রথম অংশের ভিত্তি।

​২. 'ফাঁসির ফল': চরম আত্মত্যাগ ও নীরবতা
​উক্তিটির দ্বিতীয় ও সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ হলো—"ফাঁসিতে ঝুলেছে জামায়াত নেতারা আর ফল ভোগ করছে বিএনপি।" এটি মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকরের সময়কার পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে।
​জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি: জামায়াত মনে করে, তাদের শীর্ষ নেতাদের আত্মত্যাগ ও চরম মূল্য দেওয়ার পরও বিএনপি তাদের পাশে সেভাবে দাঁড়ায়নি বা তাদের আদর্শিক সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই আত্মত্যাগ শুধু বিএনপির ক্ষমতার পথই সুগম করেনি, বরং আওয়ামী লীগ-বিরোধী আন্দোলনেও জামায়াত কর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপি সেই ত্যাগের রাজনৈতিক ফল ভোগ করেছে, আর জামায়াত হয়েছে নিঃস্ব।
​রাজনৈতিক সুবিধা: জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি বিএনপিকে বৃহত্তর পরিসরে ইসলামপন্থী ভোটারদের সহানুভূতি লাভের সুযোগ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে, জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে তারা নিজেদের অপেক্ষাকৃত উদার দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে।

​৩. 'আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলা': আদর্শিক বিচ্যুতি
​ডা. তাহেরের বক্তব্যের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অভিযোগ হলো—"এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছে বিএনপি"। এই অভিযোগ মূলত দুটি বিষয়কে নির্দেশ করে:
​ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে ঝুঁকে যাওয়া: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিএনপি কৌশলগত কারণে জামায়াত থেকে নিজেদের কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাষার কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। এটি জামায়াতের কাছে তাদের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং ইসলামী মূল্যবোধকে উপেক্ষা করার নামান্তর।
​রাজনৈতিক সুবিধাভোগ: জামায়াতের নেতারা মনে করেন, বিএনপি এখন জামায়াতকে বাদ দিয়ে এককভাবে কিংবা অন্য কোনো জোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পথ খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে, জামায়াতের প্রতি নমনীয়তা দেখালে আওয়ামী লীগ বা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে—এই ভয়ে বিএনপি এখন জামায়াতের ঐতিহাসিক মিত্রতার কথা ভুলে গিয়ে আওয়ামী লীগের মতো 'ধর্মনিরপেক্ষ' বা 'মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি'র কাছাকাছি ভাষা ব্যবহার করছে।
​৪. উপসংহার: জোটের ভাঙন ও ভবিষ্যতের রাজনীতি
​ডা. তাহেরের এই উক্তিটি মূলত জামায়াত-বিএনপি জোটের আদর্শিক ও মানসিক ভাঙনের ইঙ্গিতবাহী। এটি স্পষ্ট করে যে, জামায়াত নিজেদের কেবল ব্যবহৃত একটি শক্তি হিসেবে দেখছে, যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেও তার ন্যায্য রাজনৈতিক ফল বা স্বীকৃতি পায়নি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াত মূলত তাদের নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করছে এবং বিএনপিকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ও অকৃতজ্ঞতার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।

​বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বিভেদ ভবিষ্যতে দুটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে:
​১.  বিএনপির চ্যালেঞ্জ: বিএনপির জন্য জামায়াতকে দূরে ঠেলে দিয়ে বৃহৎ ইসলামী জনভোটকে নিজেদের পক্ষে রাখা আরও কঠিন হবে।
২.  জামায়াতের নতুন কৌশল: জামায়াত সম্ভবত এককভাবে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিতে পারে।
​এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে জোট একটি সাময়িক কৌশল হলেও, আদর্শিক সংঘাত ও স্বার্থের সংমিশ্রণ দীর্ঘমেয়াদে সেই জোটের স্থায়িত্বকে বিপন্ন করে তোলে।
৩/জামায়াতের আরো একটি কৌশল লখ্য করা যাচ্ছে, আর তা হলো ইসলামী দলগুলোর সাথে ঐক্যের চেষ্টা। এটা বিএনপির জন্য চিন্তার বিষয় হতে পারে, কারণ বাংলাদেশের ৯৬ % জনগণ মুসলিম তারা চাইবে ইসলামী দল ক্ষমতায় আসুক।
------:-----
✍️ এআই মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
০৩/১১/২০২৫


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫