ছোট গল্প 👨👦 "দুটো চায়ের কাপ" ☕
গৌতম আর তার একমাত্র ছেলে অর্ণবের সম্পর্কটা ছিল দু'টো সমান্তরাল রেখার মতো—একে অপরের খুব কাছাকাছি, কিন্তু কখনোই সেভাবে মিলিত না হওয়া। ভালোবাসা ছিল, গভীর শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু সেই পরিচিত 'আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা' বা 'ভালো আছি, বাবা' গোছের কথাবার্তা তাদের মধ্যে ছিল না। তাদের প্রকাশের ভাষা ছিল কাজ।
অর্ণব সদ্য তার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একটি ভালো কোম্পানিতে যোগ দিয়েছে। সকাল সাতটার ট্রেন ধরতে হয় তাকে।
প্রতিদিন সকালে, ঠিক ৬টা ১৫ মিনিটে, অর্ণব যখন ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরে ঢুকত, দেখত তার পড়ার টেবিলে একটি স্টিলের ফ্লাস্ক রাখা। ফ্লাস্কের ঢাকনাটা সাবধানে খোলা, যাতে গরম চা থেকে হালকা ধোঁয়া বের হতে পারে। পাশে থাকত খবরের কাগজটা ভাঁজ করা। গৌতমবাবুকে সে কখনোই চা রাখতে দেখত না। তিনি হয়তো তার আগেই স্নানে বা মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে যেতেন।
অর্ণবও কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি, "বাবা, এত সকালে উঠে চা কেন করো?" বা "ধন্যবাদ, বাবা।" সে নিঃশব্দে ফ্লাস্কের চা-টুকু ঢেলে খেত আর কাজে বেরিয়ে পড়ত।
গৌতমবাবু ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। তার অবসর সময় কাটত বাগানে আর পুরোনো বইপত্রের মধ্যে।
একবার অর্ণবের খুব জ্বর হলো। তিন দিন সে অফিসে যেতে পারল না। প্রথম দিন দুপুরে, জ্বর যখন ১০৩ ডিগ্রি, অর্ণব দেখল তার পাশে একটা টিফিন বাক্স। তাতে সুজির নরম খিচুড়ি আর একটা সেদ্ধ ডিম। কোনো শব্দ নেই, কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু যত্নটুকু। অর্ণব জানে, তার বাবার হাত ছাড়া এমন সুস্বাদু আর পেটে সওয়া খিচুড়ি আর কারও পক্ষে বানানো সম্ভব না। অর্ণব মুখ তুলে দেখল, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা, হাতে একটি গরম জলের বোতল।
"খেয়ে জলটা খেয়ে নিস," শান্ত স্বরে গৌতমবাবু বললেন।
অর্ণব মৃদুভাবে মাথা নাড়ল। "ঠিক আছে।" এটুকুই।
জ্বর সেরে যাওয়ার পর, অর্ণব অফিস থেকে ফেরার পথে বাবার জন্য একটা নতুন গার্ডেনিং গ্লাভস কিনল। গৌতমবাবুর পুরোনো গ্লাভসটা ফেটে গিয়েছিল। রাতে খাবার পর, সে চুপচাপ গ্লাভসটা বাবার বাগানের টুলের ওপর রেখে এল।
পরের দিন সকালে, গৌতমবাবু সেই নতুন গ্লাভস পরেই কাজ শুরু করলেন। তিনি একবারও অর্ণবকে জিজ্ঞেস করলেন না, "কোথায় পেলি?" বা "কেন কিনলি?" শুধু একবার কাজের ফাঁকে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, যা হাজার কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দিল।
একদিন, অফিসের কাজে অর্ণবকে পাঁচ দিনের জন্য ভিন্ শহরে যেতে হলো। সকালে রওনা দেওয়ার আগে, বাবার সেই পুরোনো টেবিলে চা-এর ফ্লাস্কটা না দেখে তার মনটা একটু খুঁতখুঁত করতে লাগলো। সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি, এমন সময় বাবা তাকে ডাকলেন।
"এই নে," গৌতমবাবু একটা পুরোনো ব্যাগের দিকে ইশারা করলেন। "তোর মায়ের হাতের বানানো আচার। তোর টিফিনে নিয়ে যাস। গরম ভাতের সাথে ভালো লাগবে।"
অর্ণব ব্যাগটা নিল। "আচ্ছা।"
দরজা পর্যন্ত এসে অর্ণব ঘুরে দাঁড়ালো। সে দেখল, বাবা তার দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে আছেন। অর্ণব কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "সাবধানে থেকো, বাবা।"
গৌতমবাবু হাসলেন। এবার আর মৃদু হাসি নয়, যেন অনেক দিনের জমানো মেঘ কেটে যাওয়া হাসি। তিনি বললেন, "আমার চিন্তা নেই। তুই ফোন করিস, পৌঁছলে।"
অর্ণব বের হলো। তার মনে হলো, এই প্রথম তার বাবা তাকে প্রকাশ্যেই বললেন, 'আমি তোর খোঁজ রাখব।' এবং সে নিজেও হয়তো এই প্রথম তার বাবাকে পরোক্ষভাবে বলল, 'তোমার জন্য আমার চিন্তা হয়।'
ভিন্ শহরে পাঁচ দিন অর্ণবের কাছে প্রতিটা মুহূর্ত বাবার কথা মনে পড়ছিল। সে দেখল, ব্যাগের ভেতরের একটি ছোট পকেটে একটি নতুন টুথব্রাশ আর একটি ছোট চিরুনি রাখা আছে—যা অর্ণব গোছাতে ভুলে গিয়েছিল।
দূরত্বে এসে অর্ণব বুঝতে পারল, তাদের সম্পর্কটা 'ভালোবাসি' শব্দটি দিয়ে তৈরি নয়। এটি তৈরি হয়েছে বাবার দেওয়া সকালের চা, মায়ের হাতের আচার, খিচুড়ির টিফিন বক্স আর ছেলের দেওয়া নতুন গার্ডেনিং গ্লাভস দিয়ে। তাদের ভালোবাসা কোনো শব্দে নয়, বরং এই নীরব যত্নের আদান-প্রদানের মধ্যেই বেঁচে থাকে।
:-
✍️ এআই মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
০৮/১১/২০২৫
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন