গল্প : মরীচিকার পেছনে এক জীবন-:নীলার বাবা যখন সরকারি কর্মকর্তার পদ থেকে অবসরে যান, তখন পুরো সোনাগাজী এলাকায় তাদের পরিবারের একটা আলাদা সম্মান ছিল। সেই সম্মানের মুকুটে উজ্জ্বল পালক ছিল নীলা। মাস্টার্স পাস করা নম্র, শান্ত মেয়েটি যখন স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করল, সবাই ভেবেছিল ওর ভবিষ্যৎ হবে আলোয় ঘেরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নীলার পরিচয় হলো আকাশের সাথে। এলাকার বখাটে হিসেবে যার পরিচিতি থাকলেও, সে সময় সে নিজেকে বদলে ফেলার এক নিখুঁত অভিনয় করেছিল।
মিথ্যে আশার বিদেশ বিভুঁই
বিয়ের পর নীলা ও তার মা ভেবেছিলেন, আকাশকে ভালো পথে আনার একটাই উপায়—তাকে দেশের বাইরে পাঠানো। "মানুষ দূরে গেলে হয়তো সংসারের টান বুঝবে"—এই আশায় মা-মেয়ে নিজেদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিলেন। নীলার গয়না, তার মায়ের জমানো অলঙ্কার—সব বিক্রি করে আকাশকে বিদেশে পাঠানো হলো। কিন্তু নেশা আর অসাধু রাজনীতি যার রক্তে, তাকে কি আর মরুভূমির তপ্ত হাওয়া ভালো করতে পারে?
কাউকে কিছু না বলে, কাজের মায়া ত্যাগ করে আকাশ বারবার দেশে ফিরে আসত। তার মাথায় তখন চাদাবাজি আর তথাকথিত "নেতা" হওয়ার ভূত। ৫ই আগস্টের পর যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো, আকাশ তখন পাকাপাকিভাবে ফিরে এল। সে এখন সারাদিন মিছিলে চিল্কার করে আর নেশার আড্ডায় বুঁদ হয়ে থাকে। ঘরে ছয় বছরের অসুস্থ মেয়ে আর ছোট ছেলের কোনো খোঁজ সে রাখে না।
সম্মান বনাম অন্ধকার
সংসার চালাতে না পেরে নীলা যখন প্রতিবাদ করত, তখন জুটত কপালে মারধর আর খুনের হুমকি। স্কুলের চাকরিটাও গেল আকাশের বিশৃঙ্খল আচরণের জন্য। একদিকে ভাইদের গয়না ফেরানোর চাপ, অন্যদিকে পাওনাদারদের রোজকার গালাগাল—নীলা তখন জীবন্ত এক লাশের মতো দিন কাটাচ্ছিল।
অবশেষে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তার। বাবার বাড়ির সম্মান আর নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে সে একদিন দুধের ছেলেকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। কিন্তু বখাটে আকাশ যে কত নিচ হতে পারে, তা নীলা কল্পনাও করতে পারেনি।
ডিজিটাল লাঞ্ছনা
নিজের অপকর্ম ঢাকতে আকাশ সোস্যাল মিডিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল। নীলার ছবি আর তার সরকারি কর্মকর্তা বাবার ফোন নম্বর দিয়ে সে ফেসবুকে কান্নাকাটি শুরু করল। "স্ত্রীর নিখোঁজ" হওয়ার নাটক সাজিয়ে সে নিজেকে অসহায় প্রমাণ করার চেষ্টা করল, অথচ সে একবারও ভাবল না যে এর ফলে একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
নীলা আজ কোথাও লুকিয়ে আছে, হয়তো অন্ধকার কোনো ঘরে বসে সে ভাবছে—কেন সে একটি মাস্টার্স ডিগ্রিধারী মেয়ে হয়েও একজন বখাটের মায়াজালে নিজের জীবনকে সঁপে দিয়েছিল? আইনের আশ্রয়ে যাবে সে পথও বন্ধ, কারণ আকাশের রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
উপসংহার:
গল্পটি শেষ হয়েও হলো না। কারণ বাস্তব জীবনের এই নীলাদের বিচার পাওয়ার পথ এখনো বড্ড কঠিন। মোহ আর অন্ধ ভালোবাসার চেয়ে যে শিক্ষা ও আত্মসম্মান বড়, নীলার এই ট্র্যাজেডি যেন সমাজের অন্যান্য মেয়েদের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে থাকে।
✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন