সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রবাসীর লাগেজ

 


​প্রবাসীর লাগেজ:

ঘামের বিনিময়ে কেনা স্বপ্নের সিন্দুক, শুধু ব্যাগ নয়...

​প্রবাসীর লাগেজ—এই কয়েকটি শব্দে কেবল চামড়া বা কাপড়ের তৈরি একটি ভ্রমণ-উপকরণ বোঝায় না। এটি আসলে একজন প্রবাসীর হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বছরের পর বছর ধরে জমানো ত্যাগ, ধৈর্য আর নিঃশব্দ কান্নার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে।

​দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার-পরিজন থেকে বহুদূরে, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মাঝে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে মানুষটি মাসের পর মাস টাকা জমায়, সেই টাকা দিয়েই কেনা হয় লাগেজের ভেতরের প্রতিটা জিনিস। এই লাগেজ যখন দেশে ফিরে, তখন এর ওজন পরিমাপ করা হয় কেবল কিলোগ্রামে কিন্তু একজন প্রবাসী এর পরিমাপ করে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো আশা ও স্বপ্নের ভারে।


​আবেগ ও ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি

​প্রবাসীর লাগেজের ভেতরের জিনিসগুলো কেবল বস্তু নয়, এগুলি হলো ​মায়ের হাসি: লাগেজের এক কোণে রাখা সামান্য কিছু ওষুধ বা শাড়ি, যা কেবল মায়ের সুস্থতা আর মুখের হাসির জন্য আনা।

​আর বাবার জন্য কেনা একটা পাঞ্জাবি বা চশমা, যার বিনিময়ে প্রবাসী চায় শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া সেই চিরায়ত দোয়া।

প্রতিটি প্রবাসীর ​স্ত্রীর অপেক্ষা, স্ত্রীর জন্য আনা গয়না বা পোশাক, যা দিয়ে সে পূরণ করতে চায় বিয়ের পর থেকে জমতে থাকা দীর্ঘ প্রতীক্ষার ঋণ।

​সন্তানের ভবিষ্যৎ: সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটি হলো টাকার বান্ডিল—যা তাদের সন্তানের ভালো স্কুলে পড়া, পুষ্টিকর খাবার এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য জমানো।

​এজন্য, প্রবাসীর লাগেজ শুধু 'স্বপ্ন কেনার বাক্স' নয়, এটি হলো প্রবাসে থাকা মানুষটির জীবনের সেরা অংশ, যা সে তার প্রিয়জনদের জন্য আলাদা করে রেখেছিল।

​২. অর্থনৈতিক গুরুত্বের অপরিহার্যতা

​লাগেজের এই ব্যক্তিগত স্বপ্নের পাশাপাশি, এর একটি বিশাল জাতীয় অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। একজন প্রবাসীর লাগেজের মধ্যে থাকা প্রতিটি ডলারের বান্ডিল আমাদের দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে মজবুত করে।

​রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি আমাদের প্রবাসীরা হলেন দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে, যা জাতীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।

​ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফসল- এই টাকা রাতারাতি আসে না। আসে মরুভূমির তীব্র রোদ, ফ্যাক্টরির বিষাক্ত ধোঁয়া, বা কনকনে ঠান্ডায় ওভারটাইম ডিউটি করে। একজন প্রবাসী নিজের জীবনের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে যে অর্থ পাঠায়, তা আমাদের অর্থনীতিতে সোনার চেয়েও দামি।

​৩. যখন স্বপ্ন হয় ভূলুণ্ঠিত

​কিন্তু যখনই এই লাগেজ বিমানবন্দরে খোলা পড়ে থাকে, যখন টাকা, উপহার আর ভালোবাসার জিনিসপত্রগুলো চুরি হয়ে যায়—তখন শুধু একটি ব্যাগ খুলে জিনিস চুরি হয় না।

চুরি হয় তার স্পন্দন ও স্বপ্ন ।

বিমান বন্দরে কাটা লাগেজর অবসিষ্ট মালামাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে ​ভেঙে যায় আস্থা, এই দৃশ্য প্রবাসীর হৃদয়ের গভীরে থাকা আস্থা ও সম্মানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে, 'আমার এই কষ্টার্জিত অর্থের কি কোনো মূল্য নেই?'

​অপমানিত হয় স্বপ্ন যারা এই দৃশ্য দেখে হাসে বা তামাশা করে, তারা ভুলে যায় এই লাগেজের প্রতিটি সুতোয় লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের নির্ঘুম রাত, অপমান, এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অদম্য লড়াই। তারা প্রবাসীর ত্যাগকে মূল্য না দিয়ে কেবল তার "অর্থ" বা "লাগেজ"-কে দেখছে।

​প্রবাসীরা কখনোই চান না তাদের ত্যাগ নিয়ে কেউ করুণা করুক, তারা কেবল চান তাদের কষ্টার্জিত অর্থের ও স্বপ্নের প্রতি যথাযথ সম্মান।


পরি শেষে ​উপসংহারে বলতে চাই ​আসুন, আমরা প্রবাসী ভাই-বোনদের শুধু 'টাকা পাঠানো মানুষ' হিসেবে না দেখে, তাদের ত্যাগ, পরিশ্রম এবং দেশের প্রতি তাদের অপরিহার্য অবদানকে সম্মান জানাই।

​লাগেজ যখন হাতে আসে, তখন মনে রাখবেন—আপনি শুধু একটা ব্যাগ পাচ্ছেন না, আপনি পাচ্ছেন একটি মানুষের জীবনের একটি অধ্যায়, ঘামের বিনিময়ে কেনা একরাশ স্বপ্ন।

​আল্লাহ যেন প্রতিটা প্রবাসীর মাল, সম্মান ও স্বপ্ন হেফাজতে রাখেন। তাদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায়। আমিন। 🤲

বিঃদ্রঃ প্রবাসীদের দুই মাসের বেশি থাকলে মোবাইল রেজিস্ট্রেশন ও শুল্ক মুক্ত দুইটার বেশি মোবাইল নিতে না পারার যে আইন করা হয়েছে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

✍️ এআই মোহাম্মদ মিজান

কুয়েত থেকে

০৭ /১২ /২০২৫ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সময়ের উক্তি : ✍️মোহাম্মদ মিজান

সময়ের উক্তি ((((লেখক✍️মোহাম্মদ মিজান)))) বিবস্ত্রকে নির্লজ্জ বললে কিবা যায় আসে ! যাঁকে দেখে লজ্জা শরম মিটমিটিয়ে হাসে! হিংসুটেরা মহা খুশি আজ মাজারে করবে ফুর্তি, তাড়িয়ে ছাড়ল কুরআন পাখি দিয়ে ভ্রান্ত যুক্তি । অন্ধের দেশে   কুরআন আয়না          বেচতে এলেন                   আজহারী,             গাঁজার কোলকি           হাতে নিয়ে    তাড়িয়ে ছাড়ল মাজারী। (মোহাম্মদ মিজান) কে মাজারী?কে বাজারি? চিনিয়ে দিল আজহারী, বুঝে গেছেন এ যুবসমাজ কুরআন বেশি দরকারি। (মোহাম্মদ মিজান) নর্তকী আর হরতকি কদিন থাকে শাখে? ভালো মানুষেরা এ তেল গায়ে কি আর মাখে? (((মোহাম্মদ মিজান))) ঝর্ড় বৃষ্টি কিছুই নেই তবু হুজুরের       জনপ্রিয়তার সংকট , বর্তমান যুবসমাজ সচেতন তাই        শুরু হয়েছে বয়কট। (((মোহাম্মদ মিজা...

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

যদি এমন হয়!!!

 যদি এমন হয়!!!  ✍️ মোহাম্মদ মিজান ............ 🇧🇩 ........  #আইচ্ছা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস স্যার যদি বলেন চার বাহীনির প্রধান এখন থেকে আমি এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেই আমি এই পদ গুলো ছেড়ে দেব, তখন কি করবেন? #আগামী কাল ঘুম থেকে উঠে যদি শুনেন প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস স্যার আওয়ামী লীগের নিয়োগ দেওয়া বিতর্কিত ব্যক্তি শাহাব উদ্দিন চুপ্পুকে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন! এবং তিনি ঘোষণা করেছেন যে আগামীতে যে নির্বাচন হবে সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে তারাই একজন যোগ্য লোককে নতুন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিবে সবার মতামতের ভিত্তিতে, তখন কারো কিছু করার থাকবে কী?  #আজকে কেন জানি আমার মনে হচ্ছে যদি নির্বাচন কমিশন এমন একটা আইন জারি করে যে আগামী নির্বাচনে যেই দল যে আসনে প্রার্থী ঘোষণা করবে সেখানে যদি ঐ দলেরই কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ায় তবে ঐ দলের কেউ ঐ আসনে আর নির্বাচন করতে পারবে না, দেশের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন এমন আইন করতেই পারে তখন দল গুলোর অবস্থা কেমন হবে?  #সর্ব শেষ একটা কথা বলি - য...