সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ট্রাম্পের পরবর্তী চাল

 

ট্রাম্পের পরবর্তী চাল: মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং একটি নতুন ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ড
বিশ্বরাজনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় — এটি আসলে বৃহত্তর এক বৈশ্বিক কৌশলের অংশ। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে একটি ছক স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ইরান যুদ্ধের পর্দা নামলে পরবর্তী মঞ্চ হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। আর সেই মঞ্চের কেন্দ্রে থাকতে পারে মিয়ানমার। এই সমীকরণে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মিয়ানমার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মিয়ানমার ভৌগোলিকভাবে ভারত, চীন ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর এই দেশের ভেতর দিয়ে গেছে। কিয়াউকপিউ বন্দর থেকে শুরু করে ইউনান পর্যন্ত চীনের বিনিয়োগ এবং কৌশলগত উপস্থিতি বিশাল। সহজ কথায়, মিয়ানমার চীনের ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি প্রধান দরজা।
ট্রাম্পের কৌশল যদি হয় চীনকে তার নিজের উঠানে চাপে ফেলা, তাহলে মিয়ানমার সেই কৌশলের আদর্শ রণক্ষেত্র। একটি অস্থির মিয়ানমার চীনের বিনিয়োগ, সরবরাহ পথ এবং সামরিক কৌশল — সবকিছুকেই হুমকিতে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ভূমিকা ও ঝুঁকি
এখানেই বাংলাদেশের প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত। ইতোমধ্যে দেশটি দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করছে — যা একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার "মানবিক করিডোর"-এর দাবিটি নিরীহ মনে হলেও, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মানবিক করিডোরের আড়ালে কার্যত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। একবার এই করিডোর স্থাপিত হলে তা সামরিক লজিস্টিকসের পথ হয়ে উঠতে পারে। এটি বাংলাদেশকে অনিচ্ছায় হলেও একটি সক্রিয় সংঘাতের অংশীদার বানিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তিনটি বড় ঝুঁকি স্পষ্ট:
প্রথমত, চীনের প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশ চীনের একটি বড় বিনিয়োগের গন্তব্য। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে একাধিক অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি মার্কিন কৌশলের সঙ্গী হয়, তাহলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারতের হিসাব-নিকাশ। ভারত মিয়ানমারে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ড যদি তৃতীয় শক্তির হাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন জটিলতা তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা। সীমান্ত সংঘাতের উত্তাপ যদি বাংলাদেশের ভেতরে আসে, তাহলে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকটে বিপর্যস্ত কক্সবাজার অঞ্চল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের পরিস্থিতি এবং একটি প্যাটার্ন
পাকিস্তানের দিকে তাকালে একটি পরিচিত কৌশল দেখা যায়। আফগানিস্তানের পরিত্যক্ত ঘাঁটি পুনরুদ্ধার ও ইরান-বিরোধী মার্কিন কৌশলে সহযোগিতার জন্য পাকিস্তানের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তান রাজি না হলে মিডিয়া প্রোপাগান্ডা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক চাপ — সবই আসতে পারে। ইতিহাস বলে, আমেরিকা তার সিরিয়ালে একটি একটি করে সমস্যা মোকাবেলা করে। ইরান-পরবর্তী অধ্যায়ে পাকিস্তান বা মিয়ানমার — যেকোনো একটি পরবর্তী টার্গেট হওয়াটা অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশের করণীয়
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। কোনো একটি পক্ষের ছাউনিতে ঢুকে পড়া মানে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলা। বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে — বড় শক্তিগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, দুর্বল রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব নয়।
ভূরাজনীতির এই দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ যেন নিজে গুটি না হয়ে যায় — এটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক প্রবণতা ও বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে রচিত একটি মতামতধর্মী প্রবন্ধ। এতে উল্লিখিত ঘটনাগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নিশ্চিত তথ্য নয়।
✍️ Al মোহাম্মদ মিজান 
কুয়েত থেকে
২৩/০৩/২০২৬

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫