বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা: একটি পর্যালোচনা
ভূমিকা —২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনমনে স্থিতিশীলতার আশা থাকলেও, সাম্প্রতিক চিত্র ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সহিংসতা এবং অপপ্রচারের এক নতুন সংস্কৃতি দানা বেঁধেছে। জাতীয় গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি এবং হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নাগরিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জাতীয় সংকট:- জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (বিএনপি-ছাত্রদল) সংশ্লিষ্টতায় কয়েকশ খুনের ঘটনা ঘটেছে। কেবল গত মাসেই (মার্চ/এপ্রিলের প্রেক্ষিতে) ২২টি খুন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে দেশজুড়ে ৫০০-র বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
একদিকে যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তীব্র লোডশেডিং এবং বাস ভাড়া বৃদ্ধিতে জনজীবন বিপর্যস্ত। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের সংস্কারের নামে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদানের চেষ্টার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি:- দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলো বরাবরই জাতীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি উঠলেও বাস্তবে ছাত্রদলের সশস্ত্র তৎপরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, পাবনা ও কুমিল্লায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাগুলো শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট করছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রশিবিরের এক নেতার ওপর যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে, তা আইনি শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নামান্তর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র বিদ্যমান। ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধি, এমনকি দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর দফায় দফায় হামলা প্রমাণ করে যে, ক্যাম্পাসগুলোতে ভিন্নমতের কোনো জায়গা রাখা হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের অভিশাপ 'গেস্টরুম কালচার' নতুন করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ও গুজব সন্ত্রাস:- বর্তমান সময়ের রাজনীতির একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি এখন গুজব ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক দায়িত্বশীল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ভুয়া স্ক্রিনশট বানিয়ে তাকে হত্যার হুমকি এবং শাহবাগ থানায় মব তৈরির ঘটনাটি আধুনিক যুগের ভয়াবহ 'ডিজিটাল লিঞ্চিং'-এর উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলো উক্ত স্ক্রিনশটটি বানোয়াট প্রমাণ করলেও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্মীদের পক্ষ থেকে কোনো দুঃখপ্রকাশ বা সংশোধনী আসেনি।
এছাড়া 'DU Insiders' সহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজ নিয়ে যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে, তা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইডেন্টিটি চুরি ও ভুয়া পেজ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে 'দ্যা ডেইলি ডাকসু', 'আমার ডাকসু', 'মগবাজার' প্রভৃতি পেজ থেকে নিয়মিত গুজব ও এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও বেশ জোরালো।
ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মব জাস্টিস:-
সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে ফোন চেক করা এবং মারধর করার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং একটি চরম স্বৈরাচারী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। নিজ দলের কর্মীকে প্রতিপক্ষ ভেবে মারধর করার মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই অস্থিরতা বিচারবুদ্ধিহীন প্রতিহিংসা থেকে উদ্ভূত। ফোনে ব্যক্তিগত তথ্য অনুসন্ধান এবং বিনা বিচারে শারীরিক নির্যাতন 'মব জাস্টিস'-কে উৎসাহিত করছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
উপসংহার:- একটি রাষ্ট্র যখন সংস্কারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তখন প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। কিন্তু হত্যা, লুটপাট, ক্যাম্পাস দখল এবং গুজবের এই রাজনীতি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ম্লান করে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বন্ধ করা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া প্রোপাগান্ডা বন্ধ করে আইনের শাসন কায়েম করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশের স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ ও সাধারণ জনগণ কখনোই এই নৈরাজ্যকে মেনে নেবে না।
১৪ শতাধিক জুলাই শহীদ ৪০ হাজার আহতদের রক্তের দামে কেনা দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর, আর কোনো স্বৈরাচার সরকার দেখতে চায় না বাংলাদেশের মানুষ।
শুরুতেই জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে, রাস্তায় নামতে হবে— তা নাহলে আবারো আমরা পরাধীনতার শিকলে বন্দি হবো।
----———----
লেখক ✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
২৭/০৪/২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন