সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কার্ডের মহিমা ও মনস্তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং

 কার্ডের মহিমা ও মনস্তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং: একটি ডিজিটাল ধাঁধা

​বর্তমান সময়ে আমাদের জীবন যেন এক একটি 'কার্ডে'র ফ্রেমে বন্দি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, প্রবাসী কার্ড থেকে শুরু করে বিধবা বা বয়স্ক ভাতা—সবই যেন নাগরিকত্বের এক একটি নতুন পরিচয়। কিন্তু এই কার্ডের রাজনীতির আড়ালে যখন গাণিতিক চাতুর্য যোগ হয়, তখন তাকে আর সাধারণ সেবা বলা যায় না; তা হয়ে ওঠে এক সুনিপুণ 'ইঞ্জিনিয়ারিং'।

​লাভ-ক্ষতির অদ্ভুত সমীকরণ

​চলুন একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। বাজারে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ধরা যাক ১৩০০ টাকা। হঠাৎ করেই তার দাম বাড়িয়ে করা হলো ১৯৪০ টাকা। অর্থাৎ সরাসরি ৬৪০ টাকা বৃদ্ধি। সাধারণ মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার কথা। কিন্তু ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হয় '৫০০ টাকার ফ্রি এলপিজি কার্ড'।

​এখানেই আসল খেলা! ভোক্তা যখন ৫০০ টাকার কার্ডটি হাতে পান, তিনি ভুলে যান যে তার পকেট থেকে আগেই ৬৪০ টাকা বাড়তি নিয়ে নেওয়া হয়েছে। কার্ডের ৫০০ টাকা বাদ দিলেও দিনশেষে আরও ১৪০ টাকা ভোক্তার পকেট থেকেই বেশি যাচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই 'ফ্রি কার্ড' পাওয়ার আনন্দে সাধারণ মানুষ কৃতজ্ঞ থাকে। তারা ভাবে, "সরকার তো আমাদের ৫০০ টাকা দিল!"

​দুই পক্ষই খুশি: সার্থক পরিকল্পনা

​এই কৌশলী পরিকল্পনায় কোনো পক্ষই অখুশি নয়:

​সেবা প্রদানকারী: তারা বর্ধিত মূল্যের মাধ্যমে শুধু বাড়তি খরচই তুলে নিচ্ছে না, বরং কার্ডের আড়ালে আরও ১৪০ টাকা অতিরিক্ত লাভ নিশ্চিত করছে।

​ভোক্তা: সরাসরি পকেট কাটার চেয়ে কার্ডের মাধ্যমে 'উপহার' পাওয়ার মানসিক তৃপ্তিতে তারা বিভোর। ৬৪০ টাকা হারানোর কষ্টের চেয়ে ৫০০ টাকার কার্ড পাওয়ার আনন্দ এখানে বড় হয়ে দেখা দেয়।

​উপসংহার

​ভাতা বা কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন এই সুবিধাগুলো গাণিতিক মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক লাভে রূপান্তর করা হয়, তখন তাকে জনসেবা না বলে 'মনস্তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং' বলাই শ্রেয়।

​আসলে আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সরাসরি পকেট কাটা অপরাধ, কিন্তু 'কার্ড' দিয়ে পকেট কাটা হলো একটি 'গ্রেট প্ল্যান'!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫