সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু নিকটে

ভাইএকদিন কিছু স্বপ্নবাজ মানুষ পরিকল্পনা করেছেন তারা একটা ব্যাংক করবেন। তবে প্রচলিত ব্যাংক নয়। সুদমুক্ত ব্যাংক। এটা সহজ ব্যাপার ছিল না। তারা যখন এই চিন্তা করছিলেন তখন এদেশের মানুষ ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল ছিল না। তারপরও সেই দূরদর্শী মানুষগুলো বুঝতে পেরেছিলো একদিন মানুষ ব্যাংক ছাড়া চলতে পারবে না।

এই লক্ষ্যে তারা ১৯৭৬ সালে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তানায়ক মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের নেতৃত্বে ঢাকায় ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত করে।

সেসময় বেসরকারি খাতে কোন ব্যাংক ছিল না। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ব ছয়টি ব্যাংক ছিল।

প্রথমেই তারা বাধাগ্রস্থ হয় সরকার থেকে। আইন নাই, নিয়ম নাই, জনশক্তি নাই ইত্যাদি অজুহাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা আটকে থাকে। সেসময় ক্ষমতায় ছিলেন জিয়া। কেউ সেই ব্যাংকে ইনভেস্ট করতে রাজি হয় না। ঐ স্বপ্নবাজ মানুষরা অনেককে বুঝিয়ে ইবনে সিনা ট্রাস্টের মাধ্যমে টাকা কালেকশন করে।

১ মহররম ১৪০০ হিজরিতে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার জন্য আনফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য স্বপ্নবাজেরা দ্বারস্ত হলেন মধ্যপাচ্যের কাছে। আপনারা জানেন মধ্যপাচ্যের প্রভাব ছিল জিয়ার উপরে। স্বপ্নবাজেরা সৌদী রাষ্ট্রদূতের কাছে গেলেন।  

তারপর বহু পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৭৯ সালে নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ মহসিন দুবাই ইসলামি ব্যাংকের অনুরূপ বাংলাদেশে একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে সুপারিশ করেন। সেই সুপারিশে চাপ দেয় সৌদী ও দুবাই।

এরপর চলতে থাকে নানা তৎপরতা। ফান্ডিং এবং ট্রেনিং এর কাজ চলতে থাকে। ব্যাংক চালানোর জন্য জনশক্তি তৈরি, প্রশিক্ষণ ম্যাটেরিয়াল ইত্যাদির কাজ চলতে থাকে।

১৯৮১ সালের মার্চে ওআইসিভূক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সম্মেলন সুদানের খার্তুমে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পেশকৃত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

এতে স্বপ্নবাজদের স্বপ্নের সীমা আরো বেড়ে যায়। বাংলাদেশের সব ব্যাংকই ইসলামী অর্থনীতির আওতায় আনার পরিকল্পনা করে।

সেই সূত্র ধরে ১৯৮১ সালে এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লেখা এক পত্রে পাকিস্তানের অনুরূপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোতেও পরীক্ষামূলকভাবে পৃথক ইসলামি ব্যাংকিং কাউন্টার চালু করে এ জন্য পৃথক লেজার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর এক মাস স্থায়ী সার্বক্ষণিক আবাসিক প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এ কোর্সে বাংলাদেশ ব্যাংক, সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

সরকারি ব্যাংকগুলোকে ইসলামী করার সব প্রচেষ্টা সরকারি সদিচ্ছার অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে জিয়া খুন হন।

বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। এর স্লোগান ছিল বিবা টু ফাইট রিবা। 

বহু চেষ্টার পর ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড নামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৮৩ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড নামে বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংকের প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয়। এরপর এর নাম হয় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। এই ব্যাংকের প্রথম মূলধন ছিল ইবনে সিনা ট্রাস্টের ১০ লক্ষ টাকা। 

তৎকালীন সৌদী রাষ্ট্রদূত ছিলে ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতিব। তিনি নিজেও বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ফাইট করেছেন। তিনি দিয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকা। সৌদী আরবের সাবেক অর্থমন্ত্রী সালেহ জুমজুম থেকে আদায় করে দিয়েছেন আরো ১৫ লক্ষ টাকা। চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে দিয়েছেন ১০ লক্ষ টাকা। এভাবেই ফান্ড ক্রিয়েট হয়েছে।

স্বপ্নবাজেরা যখন ব্যাংকের কার্যক্রম স্টার্ট করেছিলেন তখন একদল উপহাস করে বলেছিলো হাহ হা, মোল্লারা চালাবে ব্যাংক!

আরেকদল যারা নিজেদের ইসলামপন্থী দাবী করেন তারা খুঁত খুঁজতে থাকেন কীভাবে এটাকে বন্ধ করা যায়! মানুষের কাছে এর বিরুদ্ধে প্রচার করা যাতে কেউ এদের সাথে লেনদেন না করে।

আমি সেই গোত্রের কিছু মানুষকে দেখি তারা ঘোষিত সুদের কারবার করা ব্যাংকের সাথে লেনদেন করতে। এরা যে আসলে তাগুতের সহযোগী কোন সন্দেহ থাকে না।

যাই হোক সেই ব্যাংকটি সততার সাথে ব্যবসা করতে থাকে। মানুষ আস্থা রাখে স্বপ্নবাজদের উপরে। সবচেয়ে বড় ব্যাংকে পরিণত হয় ইসলামী ব্যাংক।

এরপর...  এরপর হিংসুকদের হিংসা বেড়ে যায়। তাগুত কোণঠাসা করে ফেলে স্বপ্নবাজদের। কয়েকজন স্বপ্নবাজকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে উল্লাস করে।

একদিন সরকারি নির্দেশে ডিজিএফআই সে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দখল করে নেয়। ব্যাংক চেয়ারম্যানকে অপহরণ করে পদত্যাগে বাধ্য করায়। নিজেদের মত পরিচালনা করতে থাকে।

ইসলামী ব্যাংকে ক্যু হওয়ার আগে এই ব্যাংকটি বিনিয়োগ ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ব্যাংকটি ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবসাসফল। ইসলামী ব্যাংক যা আয় করতো প্রতিবছর অন্যান্য ব্যাংকের তার অর্ধেকও আয় করার যোগ্যতা ছিল না।

এই ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি স্কলারশিপ দেয়া হত ছাত্রদের, সবচেয়ে বেশি মানবতার কল্যাণে কাজ করতো। দারিদ্র বিমোচনে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই ব্যাংকের কাছাকাছিও অন্য কোন ব্যাংক ছিল না।

আর ক্যু হওয়ার পর মাত্র এক বছর! এক বছরে ব্যাংক তার সব টাকা হারিয়ে ফেলেছে। সব খেয়ে ফেলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ লোকেরা। আজ দেখলাম ইসলামী ব্যাংক সব বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে টাকার অভাবে। কয়েকদিন পর হয়তো শুনবো ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে গেছে।  আহ তখন অপমৃত্যু হবে হবে একটি স্বপ্নের, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।
( সংগ্রহ )

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫