সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যখন সচেতন মানুষ নীরব থাকে (একটি সামাজিক বিশ্লেষণ)

 যখন সচেতন মানুষ নীরব থাকে

(একটি সামাজিক বিশ্লেষণ) 

একটি দেশের সবচেয়ে বড় বিপদ কী?

বাইরের শত্রু নয়, দারিদ্র্য নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগও নয়। একটি দেশের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো — সচেতন, শিক্ষিত মানুষের নীরবতা।

যে দেশে পড়ালেখা জানা মানুষ জেনেশুনে একজন গুন্ডাকে নেতা বানায়, একজন চোরকে প্রতিনিধি মনোনীত করে, একজন মাদক ব্যবসায়ীকে ভোট দেয় — সেই দেশে আইনের শাসন টিকিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কেন শিক্ষিত মানুষ এই ফাঁদে পড়ে?

এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে।

প্রথমত, সুবিধাবাদী মানসিকতা। "আমার কাজটা হলেই হলো" — এই চিন্তা থেকে মানুষ যোগ্যতার বদলে ক্ষমতাবানকে বেছে নেয়। যে লোকটি চাঁদাবাজ, সে কিন্তু নিজের লোকদের "সুবিধা" দিতে পারে — এই হিসেবে তাকে বেছে নেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, ভয় ও আপোষের সংস্কৃতি। সন্ত্রাসীকে চ্যালেঞ্জ করলে বিপদ, তাই চুপ থাকো। এই নীরবতা ধীরে ধীরে সমাজকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।

তৃতীয়ত, শিক্ষা আর বিবেকের বিচ্ছেদ। সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ নেই — এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি মারাত্মক ব্যর্থতা। আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী তৈরি করি — কিন্তু সচেতন নাগরিক তৈরি করি না।

পরিণতি কী হয়?

ইতিহাস বলে, যখন যোগ্য মানুষ সরে দাঁড়ায় এবং অযোগ্য-দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতা দখল করে, তখন একটি নির্দিষ্ট পরিণতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

প্রথমে আসে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংস — পুলিশ, আদালত, প্রশাসন সব দলীয় হাতিয়ারে পরিণত হয়। তারপর আসে অর্থনৈতিক লুণ্ঠন — টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর সামাজিক অবক্ষয় — মাদকের ছড়াছড়ি, তরুণ প্রজন্মের ধ্বংস, নৈতিকতার মৃত্যু। এবং সবশেষে আসে স্বৈরতন্ত্র — যখন ক্ষমতাসীনরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে তারা নিজেদের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করে।

এই চক্রটি ভাঙা তখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

দায় কার?

শুধু রাজনীতিবিদের নয়। দায় আমাদের সকলের।

যে শিক্ষক জানেন কিন্তু বলেন না, যে সাংবাদিক সত্য লুকিয়ে রাখেন, যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ভোটের দিন ঘরে বসে থাকেন, যে তরুণ রাজনীতিকে "নোংরা কাজ" ভেবে এড়িয়ে চলেন — তারা প্রত্যেকেই এই সংকটের অংশীদার।

বাংলাদেশের একটি প্রচলিত কথা আছে — "আমি ভালো থাকলেই হলো।" কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন সমাজ পচে যায়, তখন কেউই নিরাপদ থাকে না — না শিক্ষিত, না অশিক্ষিত।

পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

পরিবর্তনের পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।

সচেতন মানুষকে রাজনীতি থেকে মুখ ফেরানো বন্ধ করতে হবে। ভালো মানুষকে রাজনীতিতে আসতে হবে — অথবা যারা আসছে তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে রাজনীতি "নোংরা" হয়েছে কারণ ভালো মানুষ সেটি ছেড়ে দিয়েছে। ভোটকে অধিকার নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

সর্বোপরি, একটি কথা মনে রাখতে হবে —

"যে জাতি তার ভাগ্য নিজে গড়তে চায় না, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না।"

বাংলাদেশের মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী, তরুণ প্রজন্ম মেধাবী। শুধু দরকার সচেতন মানুষের সাহসী পদক্ষেপ। নীরবতা আর নিরাপদ নয় — এটা বুঝতে পারলেই পরিবর্তনের শুরু।

বাংলাদেশের সচেতন শিক্ষিত মানুষেরা গুন্ডা বদমাশ চোর বাটপার সন্ত্রাসী টেন্ডারবাজ চাদাঁবাজ মাদক ব্যবসায়ী মাতাল অযোগ্যদের আর কখনো নেতা মেনে নেবে না ,

আশাকরি ঈদের পর পরিবর্তন দেখতে পাবো।

আল্লাহ আমাদের সবার মঙ্গল করুন ।আমীন

✍️ মোহাম্মদ মিজান

কুয়েত থেকে

২২/০৩/২০২৬ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস

  ​প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস: নাজমুলের গল্প ​নাজিমুল—একটি নাম, যার শুরু হয় ছব্বিশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। ​কুয়েতের তপ্ত বালিতে তার জীবন কেটেছে। সূর্য ওঠার আগে শুরু হওয়া কাজ আর গভীর রাতে ফেরা—এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। কোনোদিন রাজমিস্ত্রির জোগালি, কোনোদিন দোকানের কর্মচারী, কখনও বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ। সেলাইয়ের কাজ। বিদেশী হোটেলে চা কফি বার্গার বানানো মতো কাজ । প্রতিটি ইটের কণার মতো হালাল উপার্জনের প্রতিটি টাকা ছিল তাঁর কপাল বেয়ে ঝরে পড়া নোনা জলের ফসল। এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে সয়েছেন, কারণ প্রতিটি দিনশেষে তাঁর মনে হতো, এই টাকাটা হাজার মাইল দূরে থাকা তাঁর পরিবারের মুখের হাসি হয়ে ফিরবে। ​টাকা জমলেই তিনি পাঠিয়ে দিতেন দেশে। মনে শান্তি পেতেন, ভাবতেন তাঁর ভাই-বোনেরা হয়তো তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে এই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ছে। ​কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর, যখন প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইলেন, তখন আসল চিত্রটা তাঁর সামনে এল। ​দেশে এসে তিনি দেখলেন, তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি কিছুই সুসংগঠিত নেই। বরং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই কষ্টের টাকা নিজেদে...

মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?

 মসজিদে বসে রাজনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলা যাবে কি?  ইদানিং আমাদের দেশের একটা দল বা গুষ্টি মসজিদের ভিতরে আলোচনা করা নিয়ে খুব ধার্মিকতা দেখাচ্ছে,  অথচ রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের উত্তম যুগে মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া হতো। ​মসজিদ, বিশেষ করে মসজিদে নববী, সেসময় শুধু নামাযের স্থান ছিল না। এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রাণকেন্দ্র। ​মসজিদে নববীর বহুমুখী ভূমিকা ​রাসূল (সাঃ)-এর সময় এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলোর কেন্দ্র ছিল: ​রাষ্ট্রীয় কার্যনির্বাহী কেন্দ্র: খলিফারা মসজিদে বসেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) করতেন। এটি এক প্রকার কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মতো কাজ করত। ​বিচার বিভাগীয় কেন্দ্র: মসজিদ ছিল ন্যায়বিচার ও সালিশের প্রধান স্থান। খলিফা বা নিয়োজিত বিচারকগণ এখানেই জনগণের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। শিক্ষাকেন্দ্র: নতুন মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, কুরআন ও হাদিসের দারস প্রদান এবং জ্ঞানের চর্চার ...

তৃতীয় দৃষ্টি

 তৃতীয় দৃষ্টি  ----:---- খারাপ ছবি খারাপ ভিডিও খারাপ আমি জানি, গল্প কবিতায় খারাপ শব্দ খারাপ কজনে মানি? বেশ্যা শব্দ ভীষণ খারাপ বলবে সবাই নির্দ্বিধায়, সেই বেশ্যা পাড়ার মাটি দিয়ে দুর্গা মুর্তি তৈরী হয়। কাকে তুমি খারাপ বলবে খদ্দর নাকি পতিতা? তোমার চোখে খারাপ কে চিন্তা নাকি কল্পিতা?  লজ্জা তোমার কোথায় থাকে মনে নাকি চোখে?  কেন তোমার মনে কামনা জাগে শিশু খাদ্য দেখে?  প্রশ্ন করবে নিজেকে নিজে কি পরিবর্তন দরকার! চার এপাশের সমাজ ব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্রের সরকার? --কুয়েত থেকে ১০ /০৫ /২০২৫