জিন্দা থাকলে নিন্দা: জীবন ও মৃত্যুর এক নির্মম সত্য👇
মির্জা গালিবের সেই বিখ্যাত উক্তি— “জিন্দা থাকলে নিন্দা হবেই, মৃত্যুর পর প্রশংসা তো শত্রুও করে”—জীবন দর্শনের এক গভীর ও কঠিন বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। মানুষের বেঁচে থাকা এবং তার কর্মজীবন সর্বদা সমালোচনার কণ্টকাকীর্ণ পথে চলে। সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব এমন এক বিচিত্র বুননে তৈরি যেখানে জীবিতাবস্থায় মানুষের সীমাবদ্ধতাগুলো বড় হয়ে দেখা দেয়, আর মৃত্যুর শীতল স্পর্শে সেই মানুষটিই রাতারাতি মহৎ বা প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে।
১. সমালোচনার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি
মানুষ স্বভাবগতভাবেই বিচারপ্রবণ। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যখন কাউকে সফল হতে দেখে বা সমাজবহির্ভূত কোনো কাজ করতে দেখে, তখন অবচেতনভাবেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সে অন্যের সমালোচনা শুরু করে। নিন্দা অনেক সময় হিংসা থেকে জন্ম নেয়, আবার কখনো অজ্ঞতা থেকে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, "Social Comparison" বা সামাজিক তুলনার কারণে মানুষ অন্যের কাজের ভুল ধরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যতক্ষণ একজন ব্যক্তি বেঁচে আছেন এবং সক্রিয় আছেন, ততক্ষণ তিনি কারো না কারো স্বার্থ বা মতাদর্শের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তাই নিন্দা এখানে এক প্রকার আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া।
২. জীবিত অবস্থায় অবমূল্যায়ন কেন?
জীবিত মানুষের সাথে আমাদের প্রতিযোগিতা থাকে, স্বার্থের সংঘাত থাকে এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের মাঝে ইগো বা অহংকার বোধ কাজ করে।
দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা—আমরা মানুষকে পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে না দেখে তার তাৎক্ষণিক ভুলগুলোকে বড় করে দেখি।
নৈকট্যের অবহেলা— হাতের কাছের জিনিসের মূল্য আমরা কম বুঝি। একজন মানুষের উপস্থিতি যখন চিরস্থায়ী মনে হয়, তখন তার গুণের চেয়ে দোষগুলোই চোখে বেশি পড়ে।
প্রাপ্য সম্মানে কার্পণ্য— কাউকে তার সামনে প্রশংসা করলে সে অহংকারী হয়ে উঠতে পারে—এমন এক ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমরা জীবিত মানুষকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করি।
৩. মৃত্যুর পর প্রশংসার রহস্য
মৃত্যু মানুষের সকল ভুল, ত্রুটি এবং পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মুছে দেয়। মৃত্যুর পর শত্রু কেন প্রশংসা করে, তার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
-প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি—ব্যক্তি যখন আর জীবিত থাকেন না, তখন তার সাথে কারো স্বার্থের সংঘাত থাকে না। ফলে অবচেতন মন তার ভালো দিকগুলো ভাবতে শুরু করে।
সহমর্মিতা ও ক্ষমা—: "De mortuis nil nisi bonum" (মৃতের সম্পর্কে ভালো ছাড়া কিছু বলো না)—এই প্রাচীন রোমান প্রবাদটি আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। মৃত্যুর পর মানুষের প্রতি এক ধরনের প্রাকৃতিক মায়া বা সহমর্মিতা কাজ করে।
এবং শূন্যতা অনুভব করতে থাকে— কোনো মানুষের অনুপস্থিতিই তার প্রকৃত গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। তিনি যখন ছিলেন না, তখন পৃথিবীটা কেমন ছিল আর এখন কেমন—এই তুলনাটিই তার গুণাবলীকে উজ্জ্বল করে তোলে।
৪. নিন্দাকে শক্তির রূপান্তর
মির্জা গালিবের দর্শনে নিন্দা মানেই পরাজয় নয়, বরং নিন্দা হলো আপনার সক্রিয়তার প্রমাণ।
"নিন্দা অনেক সময় প্রমাণ করে—আপনি কিছু করছেন, আপনি দৃশ্যমান, আপনি প্রভাব ফেলছেন।"
যদি কেউ আপনার সমালোচনা করে, তবে বুঝতে হবে আপনি সমাজের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেননি। বড় বড় মনীষী, বিজ্ঞানী এবং বিপ্লবীদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রত্যেকেই সমসাময়িক সমাজে চরম সমালোচিত ও নিন্দিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের অটল সংকল্পই পরবর্তীকালে তাঁদের ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
৫. করণীয়: নিজের পথে অবিচল থাকা
মানুষের কথা বা সমালোচনায় ভেঙে পড়া মানে নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচার করা। সবাইকে খুশি করা অসম্ভব একটি কাজ। তাই আমাদের উচিত—
সততা বজায় রাখা মনে রাখবেন আপনার উদ্দেশ্য সৎ হলে নিন্দার তীর আপনাকে বিদ্ধ করতে পারবে না।
বিশেষ করে চরিত্র গঠন— নিজের কাজ ও চরিত্রকে এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া যেন তা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
সমালোচনা থেকে শিক্ষা— গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে শুধরে নেওয়া এবং অযৌক্তিক নিন্দাকে উপেক্ষা করা আমার মতে খুব ভালো ।
উপসংহার বা শেষ কথা:
সময় এক মহান বিচারক। আজ যারা নিন্দা করছে, কাল তারাই হয়তো আপনার অনুপস্থিতিতে চোখের জল ফেলবে বা আপনার জয়গান গাইবে। মানুষের স্বভাব পরিবর্তন করা আমাদের হাতে নেই, কিন্তু নিজের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের হাতেই। তাই মির্জা গালিবের এই চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়ে নিন্দাকে সাফল্যের সোপান হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সুন্দর কাজ ও চরিত্র চিরকাল মানুষের মনে বেঁচে থাকে—হোক তা জীবিত অবস্থায় নিন্দার ছলে, কিংবা মৃত্যুর পর শ্রদ্ধার আবহে।
---:---
✍️ মোহাম্মদ মিজান
কুয়েত থেকে
১৪ /০৫/২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন