অন্য বসন্তের গান
লেখক ✍️ —মোহাম্মদ মিজান
সবাই যখন জেনেশুনে নির্দিষ্ট ছকে
জীবনের নাম লেখে—
বাবা কিংবা মা, ভাই কিংবা বোন—
তখন জন্মেই কারো গায়ে সেঁটে যায়
'উপেক্ষা'র এক নিষ্ঠুর লেবেল।
প্রকৃতি তাকে এঁকেছিল
অন্য কোনো রঙের তুলিতে—
কোমল, বিরল, অপূর্ব এক আলোয়।
অথচ পৃথিবীর ব্যাকরণ
তাকে চিনতেই ভুলে গেল।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে
কোনো বিভাজন চোখে পড়ে না তাদের—
শুধু থাকে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ,
যার ভেতরে লুকিয়ে আছে
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন,
ডানা মেলার গভীর আকুতি।
কিন্তু রাজপথে যখন তারা নামে,
মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিগুলো
তলোয়ারের মতো বিঁধতে থাকে বুকের ঠিক মাঝখানে।
প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে একটি নীরব যুদ্ধ।
তালি বাজানো সেই হাতগুলোর আড়ালে
কত যে না-বলা হাহাকার জমে আছে—
তার হিসেব কেউ কোনোদিন রাখেনি।
তারাও তো চেয়েছিল
কোনো এক দপ্তরে কলম ধরতে,
বইয়ের পাতায় নিজের নাম লিখতে।
চেয়েছিল প্রিয়জনের উষ্ণ হাত ধরে
গোধূলির আলোয় নিভৃতে কথা বলতে।
অথচ সমাজ তাদের শিখিয়ে দিল—
বেঁচে থাকা মানে
টিটকিরি আর করুণার মিশেলে
এক অন্তহীন, ক্লান্তিকর যুদ্ধ।
মাঝরাতে যখন দূর থেকে ট্রেনের বাঁশি ভেসে আসে,
কিংবা নির্জন বস্তির কোণে একা একটি প্রদীপ জ্বলে—
তখন তারাও কাঁদে।
সেই কান্নার কোনো লিঙ্গ নেই,
কোনো শ্রেণি নেই, কোনো বর্ণ নেই।
সেটা নিছকই
এক মানুষের গভীরতম আকুতি—
একটু স্বীকৃতির জন্য,
একটু ভালোবাসার উষ্ণতার জন্য।
অভিশাপ নয় তারা,
উপহাসের পাত্রও নয়।
তারাও এই পৃথিবীর আলো-বাতাসের সমান অংশীদার।
একই মাটিতে মিশে যাবে
সবার রক্ত, সবার দীর্ঘশ্বাস, সবার স্বপ্ন।
তবে কেন এই প্রাচীর?
কেন এই নির্মম অবহেলা?
কেন এক মানুষ আরেক মানুষকে
চিনতে এত ভয় পায়?
পূর্ণতা কেবল পুরুষত্বে নেই,
নারীত্বেও নেই শুধু—
পূর্ণতা লুকিয়ে আছে
মানুষ হয়ে ওঠার অদম্য সাহসে।
যেদিন আমরা 'মানুষ' পরিচয়ে
তাদের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারব,
সেদিন এই রুক্ষ পৃথিবীতে
আসবে এক নতুন বসন্ত—
যেখানে কোনো বিভেদ থাকবে না,
থাকবে না কোনো অবমাননার দাগ,
থাকবে শুধু
প্রাণের স্পন্দন,
মানুষের উষ্ণ নিঃশ্বাস,
আর ভালোবাসার চিরন্তন আলো।
—কুয়েত থেকে —
০৪/০৫/২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন